যুদ্ধবিরতির আলোচনায় ফেরাতে ইরান যাচ্ছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আল-থানি। ফাইল ছবি / রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিয়ে অচলাবস্থার মধ্যেই বৃহস্পতিবার ইরান সফরে যাচ্ছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আল-থানি। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা কমানো এবং আলোচনা পুনরায় শুরুর পরিবেশ তৈরির জন্যই এ সফর।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বুধবার এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ সফরের কথা জানান।
তিনি বলেছেন, কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী তেহরানে ইরানের ‘বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার’ সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকে যুদ্ধের উত্তেজনা কমানো এবং সংলাপের প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির বিষয়ে আলোচনা হবে।
আল-আনসারি বলেছেন, মতপার্থক্য নিরসন এবং এ অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বাড়াতে কূটনৈতিক পথই সবচেয়ে ভালো উপায় বলে কাতার মনে করে। সেই অবস্থানের অংশ হিসেবেই এ সফর হচ্ছে।
ইরানও সফরটি নিশ্চিত করেছে। দেশটি জানিয়েছে, বৈঠকে কাতারের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ অব্যাহত রাখা এবং অন্যান্য আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে।
কাতার ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের মিত্র এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির বেশ সুনাম রয়েছে। যদিও সমঝোতাকারীর মূল ভূমিকায় পাকিস্তান রয়েছে।
তবে, আলোচনায় কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
গত জুনে কাতারের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়, যার ফলে সাময়িকভাবে সংঘাত বন্ধ হয়েছিল। তবে জুলাইয়ে সেই সমঝোতা ভেঙে যায়।
মধ্যপ্রাচ্যে দুই পক্ষের সংঘাত এখন প্রায় ছয় মাসে গড়িয়েছে। লড়াই অনেকটাই থেমে থাকলেও কূটনৈতিক সমাধানের কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করা বিভিন্ন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার আলজাজিরাকে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু করতে তিনি ‘তাড়াহুড়ো করছেন না’। তার মতে, তেহরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ—দুটিই কার্যকর হচ্ছে।
ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমার দিক থেকে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই; যত সময়ই লাগুক।’
হরমুজ প্রণালি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
ইরান প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ চায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায়, এটি আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকুক। জুনের সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পেছনে এই মতবিরোধও ভূমিকা রেখেছিল।
এরপর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। সোমবার এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন মাত্র ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই প্রণালি দিয়ে যেত।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার তেহরানে বৈঠকে হরমুজ প্রণালি নিয়েও আলোচনা করবেন শেখ মোহাম্মদ। এ সময় ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের অবস্থায় জলপথটির পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
শেখ মোহাম্মদের সফরের দুই দিন আগে ইরান সফর করেছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি। তেহরানে তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেন।
ওই বৈঠকের পর ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে পণ্য পরিবহনের জন্য ইরান ও ওমান একটি নতুন অস্থায়ী পথের বিষয়ে একমত হয়েছে। তবে জুনের সমঝোতা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং জব্দ করা সম্পদ ছাড়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা পর্যন্ত জলপথটি পুরোপুরি খুলবে না বলে জানান তিনি।
এর আগে সংঘাতের অচলাবস্থা কাটাতে ইরানে সফর করেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। ইসলামাবাদ জানিয়েছে, ওই আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে।
তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোস্তফা খোশচেশম বলেছেন, আঞ্চলিক দেশগুলো সংলাপের জন্য চাপ দিচ্ছে। কারণ, তারা মনে করছে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনার দিকে যাচ্ছে।
তিনি বলেছেন, সংঘাত শুরু হলে তা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেবে। এর প্রভাব পুরো অঞ্চল ছাড়িয়ে আরও দূরে ছড়িয়ে পড়বে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হবে। এ কারণে এসব দেশ জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে।
সূত্র : আলজাজিরা







