উত্তেজনা আরও বাড়ল
হুতিদের হামলায় ইয়েমেনের ৩০ সেনা নিহত

ছবি: রয়টার্স
ইয়েমেনের হাদরামাউত ও মারিব প্রদেশের একাধিক সামরিক ঘাঁটিতে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ৩০ সরকারি সেনা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৫ জন। সরকারি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা।
বৃহস্পতিবার চালানো এই হামলা ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশটিতে সংঘাত আবারও তীব্র হয়ে ওঠার পর এ হামলার ঘটনা ঘটল।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি দাবি করেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ‘শত শত’ হতাহত হয়েছে।
ইয়েমেনের সেনাবাহিনী হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তাদের দাবি, হুতিদের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানের জবাবেই এ হামলা চালানো হয়েছে।
সামরিক সূত্র জানিয়েছে, মারিবের উত্তরে আল-জাওফ প্রদেশ থেকে হুতিরা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এগুলোর লক্ষ্য ছিল হাদরামাউতের আল-থিনিয়া ও আল-আবর এবং মারিবের আল-রউক এলাকার সামরিক ঘাঁটি। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আল জাজিরার ইয়েমেনবিষয়ক সম্পাদক আহমেদ আল-শালাফি জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার দিকে হামলাটি চালানো হয়। এতে হোমল্যান্ড শিল্ড ফোর্সেস, ইমার্জেন্সি ফোর্সেস এবং ফার্স্ট মিলিটারি রিজিয়নের কয়েকটি ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
২০২২ সালে সৌদি আরবের সমর্থনে গঠিত হোমল্যান্ড শিল্ড ফোর্সেস মারিব-হাদরামাউত সীমান্ত এবং সৌদি সীমান্তে দায়িত্ব পালন করছে। চলতি বছরের শুরুতে বাহিনীটি সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের বাহিনীর বিরুদ্ধেও লড়াই করেছে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রেসিডেন্টের ডিক্রির মাধ্যমে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের তত্ত্বাবধানে গঠিত হয় ইমার্জেন্সি ফোর্সেস। বাহিনীটি আল-জাওফ ও হাদরামাউতে স্থলসীমান্ত এবং হুতিবিরোধী ফ্রন্টে দায়িত্ব পালন করছে। ফার্স্ট ইমার্জেন্সি ডিভিশনের কমান্ড জানিয়েছে, সকালের প্রশিক্ষণে বিপুলসংখ্যক সেনা একত্রিত থাকায় হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়েছে।
চার বছরের স্থিতাবস্থার পর আবারও সংঘাত
ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে চার বছর তুলনামূলক শান্ত থাকার পর সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আবারও সংঘাত বেড়েছে।
ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস হামলাকে ‘কাপুরুষোচিত’ বলে অভিহিত করেছে। এক্সে দেওয়া এক বার্তায় নিহত ‘সাহসী ইয়েমেনি সেনাদের’ পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে তারা।
দূতাবাসের ভাষ্য, এই হামলা ইয়েমেনের জনগণের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের আরেকটি উদাহরণ।
অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, সৌদি সীমান্তবর্তী নাজরান শহরে হুতিদের পৃথক এক হামলায় নারী ও শিশুসহ ১১ বেসামরিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, হুতিরা নির্বিচারে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করেছে।
তবে নাজরানের হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকার করেনি হুতিরা।
হরমুজ সংকটের মধ্যেই বাড়ছে উত্তেজনা
জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্রপথে অবরোধ ঘোষণা করে হুতিরা। এরপর থেকে তারা সৌদি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছে।
২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের মাধ্যমে ইয়েমেনের বর্তমান যুদ্ধ শুরু হয়। পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক হস্তক্ষেপ করলেও এখন পর্যন্ত হুতিদের পুরোপুরি পরাজিত করতে পারেনি।
ইয়াহইয়া সারি দাবি করেছেন, সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সামরিক সমাবেশের জবাব হিসেবেই বৃহস্পতিবারের হামলা চালানো হয়েছে। পরে তিনি সরকারপন্থী যোদ্ধাদের সৌদি-সমর্থিত ঘাঁটি ছেড়ে চলে যাওয়ারও আহ্বান জানান।
অন্যদিকে ইয়েমেনের কনসালটেশন অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন অথরিটির উপপ্রধান আবদুল মালিক আল-মেখলাফি বলেছেন, ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপে পড়েই হুতিরা সরকারি বাহিনীর অবস্থানে হামলা জোরদার করেছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পশ্চিম ও মধ্য ইয়েমেনে দুই পক্ষই সেনা সমাবেশ বাড়িয়েছে। গত মাসে সানা বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। এরপর হুতিরা সৌদি আরবের আবহা বিমানবন্দরে হামলা চালায়, যা সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রতিহত করার দাবি করে।
পরবর্তীতে হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ ঘোষণা করে এবং লোহিত সাগরে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা শুরু করে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালিও কার্যত অচল হয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি রপ্তানি আরও ব্যাহত হয়েছে।
এর জবাবে ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো পশ্চিম ইয়েমেনে হুতি অবস্থান লক্ষ্য করে আবারও বিমান হামলা শুরু করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। হুতিদের দাবি, তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের ওপর ‘সৌদি অবরোধের’ প্রতিক্রিয়াতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।




