ইউরোপ থেকে এক-তৃতীয়াংশ সেনা সরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কী প্রভাব পড়বে

ছবি: রয়টার্স
ইরানে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ায় ইউরোপে সামরিক উপস্থিতি কমানোর কথা বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে এ বিষয়ে পরিকল্পনা জমা দিতে পারেন পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধ এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সম্ভাব্য নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশগুলোর উদ্বেগের মধ্যেই এই খবর সামনে এসেছে।
রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে কয়েক দশক ধরে উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা বা ন্যাটোর মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে অংশীদারত্বের ওপর নির্ভর করে আসছে ইউরোপ। তবে গত এক বছরে কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে।
কেন ইউরোপে সামরিক উপস্থিতি পুনর্বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র?
ইউরোপে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম কমানোর কয়েকটি সম্ভাব্য পথ বিবেচনা করছে পেন্টাগন। জুনে এই পর্যালোচনার বিষয়টি জানানো হয়।
জুনে ব্রাসেলসে ন্যাটোর এক বৈঠকে হেগসেথও এই পর্যালোচনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তখন তিনি জোটের অন্য সদস্যদের সমালোচনা করে বলেছিলেন, নতুন পরিবর্তনগুলো এমনভাবে করা হবে, যাতে ‘ইউরোপ ন্যাটোর প্রতিরক্ষার জন্য আরও বেশি দায়িত্ব নেবে’।
ইরানে হামলা চালাতে ইউরোপের ঘাঁটি ব্যবহারে মার্কিন বাহিনীকে অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেছিলেন হেগসেথ।
হেগসেথ যেসব বিকল্প বিবেচনা করছেন
একটি পরিকল্পনায় ইউরোপে থাকা আনুমানিক ৬৮ হাজার মার্কিন সেনার এক-তৃতীয়াংশ সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা রাখা হয়েছে। এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, এতে মূলত জার্মানি, ইতালি ও স্পেনে মোতায়েন সেনার সংখ্যা কমবে।
আরও বড় পরিসরের একটি পরিকল্পনায় ৪০ হাজার সেনা সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সামরিক বিমান, জাহাজ ও অস্ত্রও প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপের ঘাঁটি থেকে সেনাদের সরিয়ে রাশিয়ার কাছাকাছি ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে মোতায়েন করার কথাও বিবেচনা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ।
এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, ৬ নভেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন হেগসেথ।
যুক্তরাষ্ট্র কি এরই মধ্যে ইউরোপ থেকে সেনা সরিয়েছে?
এরই মধ্যে রোমানিয়ায় মোতায়েন প্রায় ২ হাজার মার্কিন সেনার প্রায় অর্ধেক সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জার্মানি থেকেও প্রায় ৫ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া চলছে। ইউরোপে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের অর্ধেকের বেশি রয়েছে জার্মানিতে।
জার্মানি থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে গত মে মাসে। এর আগে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎস ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সমালোচনা করেছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প আরও ‘অনেক দূর’ যাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনা কমানো ইউরোপের জন্য কী অর্থ বহন করবে?
থিঙ্ক ট্যাঙ্ক জার্মান মার্শাল ফান্ডের বিশ্লেষক ইয়ান লেসার বলেছেন, সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম ব্যাপকভাবে সরিয়ে নেওয়া হলে তা ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। কারণ এতে মহাদেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেবে।
ওই বিশ্লেষকের মতে, রাশিয়া ন্যাটোর সদস্যদের ওপর হামলা চালাবে এমনটা সম্ভাব্য নয়। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে মস্কো অবশ্যই কিছু সুবিধা পাবে।
তিনি যোগ করেন, কখন কোথা থেকে সেনা সরিয়ে কোথায় মোতায়েন করা হচ্ছে, তার ওপর বিষয়টি আসলে নির্ভর করে। তার মতে, এখনই ইউরোপের ওপর এর প্রভাব নিরূপণ করা কঠিন।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেছেন, পশ্চিম ইউরোপ থেকে সেনা সরিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে নেওয়া হলে তা হয়তো উদ্বেগের কারণ হবে না। কারণ জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো দ্রুত তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সেনা প্রত্যাহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রও ক্ষতির মুখে পড়বে। কারণ এর ফলে ইউরোপজুড়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা কমে যাবে। ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতারাও এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কে অবনতি কেন?
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদ থেকেই ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছেন, তারা জোটের আর্থিক বোঝার বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।
গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ওপর নির্ভর না করে ন্যাটোর দেশগুলোর উচিৎ তাদের জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করা। তবে অনেক ন্যাটো সদস্য ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতেই হিমশিম খাচ্ছে।
ন্যাটো সদস্যরা ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করতে সম্মত হয়েছে।
তবে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর অংশ না নেওয়া ট্রাম্পের অসন্তোষ আরও বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতেও তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এমনকি স্পেন ও ইতালির মতো কয়েকটি দেশ প্রকাশ্যেই ওয়াশিংটনের এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
আরেকটি বিষয় হলো শুল্ক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে। তবে গত বছর ট্রাম্প তার বাণিজ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবে ইউরোপীয় পণ্যে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন।
গত এক বছরে গ্রিনল্যান্ড নিয়েও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড কৌশলগতভাবে আর্কটিক অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে এবং সেখানে তেলসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের মজুত রয়েছে।
অন্য মার্কিন মিত্ররাও কি সমস্যার মুখে?
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা অংশীদার তাইওয়ানের ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করা কঠিন হয়ে উঠছে।
১৯৫০ সাল থেকে চীনের সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে আসছে তাইপে। তবে ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্যে এই সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, সুরক্ষার বিনিময়ে তাইওয়ানের উচিত ওয়াশিংটনকে অর্থ দেওয়া। তিনি আরও বলেছিলেন, তাইওয়ানের ‘শান্ত হওয়া’ উচিত, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে যুদ্ধে জড়াতে চায় না।
ইরানে যুদ্ধ চলতে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে সামরিক সরঞ্জাম ও সক্ষমতা ক্রমেই ইরান সংঘাতে সরিয়ে নিচ্ছে। এতে তাইওয়ানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে থাকা সর্বশেষ বিমানবাহী রণতরিটিকেও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক মাস ধরে বিরতিহীনভাবে সমুদ্রে থাকা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে সহায়তা করতেই এটি করা হয়েছে।
এ ছাড়া সৌদি আরবের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা চুক্তি রয়েছে। তবে ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে সমর্থন করতে যুক্তরাষ্ট্র অনিচ্ছুক বলেও মনে হয়েছে। এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর জ্বালানি ও সামরিক স্থাপনায় ইরানের হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।




