জম্মুতে আশ্রয়হীন শত শত রোহিঙ্গা পরিবার
- বিকল্প আশ্রয়ের খোঁজে পরিবারগুলি

ভারতের জম্মুর নারওয়ালের কারিয়ানি তালাব এলাকায় উচ্ছেদের নোটিসের পর আশ্রয় হারাচ্ছে শত শত রোহিঙ্গা পরিবার। মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ায় শুক্রবারও বহু পরিবার নিজেদের ঝুপড়ি, কাঠের ঘর ও দোকান খুলে জিনিসপত্র সরিয়ে নেয়।
জমির মালিকদের প্রশাসনের তরফে নোটিস দেওয়ার পরই তাদের জায়গা ছাড়তে বলা হয়েছে বলে বাসিন্দাদের দাবি।প্রথমে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ টি দোকান ভাঙা হয়। পরে সংলগ্ন অস্থায়ী বসতিগুলিও খালি করতে বলা হয়। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সদস্য সারওয়ারের দাবি, প্রায় ৮০ থেকে ৯০ টি অস্থায়ী ঘরে থাকা ৫০০- র বেশি পরিবারকে জায়গা ছাড়তে বলা হয়েছে। কয়েকটি পরিবারের দাবি, তারা সেখানে ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে বসবাস করছে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের হিসাব ধরলে ওই পরিবারগুলির বসবাস শুরু হয় ২০১০- ১১ সালের দিকে। অন্য এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, তিনি ২০১০ সাল থেকেই ওই এলাকায় রয়েছেন।
যদিও প্রশাসনের নোটিসে বলা হয়েছে, জমিগুলি কৃষিকাজের জন্য নির্ধারিত। তাই সেগুলি আবাসিক কাজে ভাড়া দেওয়া যায় না। জমির মালিকদের জমি খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন জমির অননুমোদিত ব্যবহার নিয়ে জম্মু ও কাশ্মীর ভূমি রাজস্ব আইনের ১৩৩-এ ধারায় নোটিস দিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, রোহিঙ্গারা যে জমিতে অস্থায়ী ঘর ও দোকান তৈরি করে থাকছিলেন। সেই জমির আইনগত মালিক তারা নন। জমির মালিকেরা তাদের জমি ভাড়া দিয়ে বা বসবাসের জন্য ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিলেন। পরে প্রশাসনের নোটিসের পর সেই জমি খালি করতে বলা হয়।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিজেদের সামান্য সঞ্চয় খরচ করে তাঁরা ঘরগুলি বসবাসযোগ্য করেছিলেন। এখন সেই ঘরই ভাঙা কাঠ ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তাদের অনেকের কাছে রাষ্ট্রপুঞ্জের শরণার্থী সংস্থার পরিচয়পত্র রয়েছে বলেও দাবি। মায়ানমারে বিভিন্ন সময় হিংসা ও নিপীড়নের পর তারা ভারতে এসেছিলেন। যাদের মধ্যে কেউ ২০১০-১১ সালে আবার কেউ ২০১৭ সালের পর। জম্মুতে দৈনিক মজুরি, আবর্জনা সংগ্রহ, গৃহস্থালির কাজ সহ নানা পেশায় সংসার চালান তারা
উচ্ছেদের পর কয়েকটি পরিবার নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে অন্য এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করছে। কোথায় তাদের স্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ২০২১ সালের মার্চেও জম্মুতে যাচাই অভিযানের পর ২৭১ জন রোহিঙ্গাকে হিরানগারের একটি কারাগারকে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ হিসাবে ব্যবহার করে সেখানে রাখা হয়েছিল। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। ২০২১ সালের এপ্রিলের এক নির্দেশে সুপ্রিমকোর্ট বলেছিল যে, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তাদের মায়ানমারে ফেরত পাঠানো যাবে না
রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা আরও একটি আইনি বিষয় তুলে ধরছেন। ভারত ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের সদস্য না হলেও, সুপ্রিমকোর্টের একাধিক রায়ে বিদেশিদেরও জীবনের অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতার সাংবিধানিক সুরক্ষা স্বীকার করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালের একটি মামলায় আদালত স্পষ্ট জানিয়েছিল, নাগরিক না হলেও কোনও ব্যক্তির জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা আইনসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়া কেড়ে নেওয়া যায় না। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের একটি রায়েও সুপ্রিমকোর্ট বলেছে, অনুচ্ছেদ ১৪ ও ২১- এর সুরক্ষা নাগরিক ও অ-নাগরিক উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা অধিকারকর্মীদের দাবি, বিকল্প নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা না করে পরিবারগুলিকে সরিয়ে দিলে নারী, শিশু ও প্রবীণরা আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বেন। অন্যদিকে প্রশাসনের বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু হল কৃষিজমির অননুমোদিত ব্যবহার এবং বিদেশিদের বসবাস নিয়ে সরকারি যাচাই ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ। আগস্টে কেন্দ্রীয় সরকারের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের কমিটি জম্মু সফর করে। সরকারি হিসাবে জম্মু কাশ্মীরে ৭,৬৫৬ জন রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করা হয়েছে।



