এক হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার ফাঁদে উধাও ২৭ কোটি টাকা

ভুক্তভোগী অশোক বিজয়ভার্গীয় একজন জ্যেষ্ঠ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট
‘হ্যালো... আমি দিব্যা বলছি’ লেখা এমনই একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা থেকেই সূচনা হয়েছিল ভারতের অন্যতম বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগ প্রতারণার। এতে গালিয়রের ৭০ বছর বয়সী এক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ২১ কোটি ৬ লাখ রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা) হারিয়েছেন। একই সঙ্গে মিলেছে হাজারো ব্যাংক হিসাবজুড়ে বিস্তৃত একটি দেশব্যাপী অর্থপাচার চক্রেরও সন্ধান।
ভুক্তভোগী অশোক বিজয়ভার্গীয় মধ্যপ্রদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা এবং একজন জ্যেষ্ঠ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে তাকে ইউএসডিটি টেথারে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হয়। সন্দেহভাজন প্রতারকেরা তাকে বিশ্বাস করান যে, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনে অসাধারণ মুনাফা পাওয়া যাবে। পরে তারা তাকে একটি লেনদেনের ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়, যা পরে ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়।
পুলিশের ভাষ্য, প্রতারণার কৌশলটি ছিল পরিচিত ধরনের। প্রথমে বিজয়ভার্গীয় ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেসের মাধ্যমে অল্প অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেন। পরে তাকে তার ব্যাংক হিসাবে ১ লাখ ৮৮ হাজার রুপি তুলে নিতে দেওয়া হয়, যাতে তার মনে হয় প্ল্যাটফর্মটি আসল। এতে আস্থা পেয়ে তিনি ধীরে ধীরে একাধিক ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি রুপি পাঠাতে থাকেন। একপর্যায়ে ওয়েবসাইটে তার হিসাবে ৩৩ কোটির বেশি রুপি জমা রয়েছে বলে দেখানো হয়, যা পরে ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়।
পরে তিনি অর্থ তুলতে চাইলে প্রতারকেরা প্রথমে আয়কর বাবদ ১০ কোটি ৮৪ লাখ রুপি এবং পরে ‘ঝুঁকি মার্জিন’ হিসেবে আরও ১ কোটি রুপি দাবি করে। তাদের দাবি ছিল, এই অর্থ পরিশোধ করলেই তার টাকা ছাড় করা হবে। তখনই বিজয়ভার্গীয় বুঝতে পারেন যে প্রতারণার শিকার হয়েছেন তিনি।
তদন্তে জানা গেছে, চুরি হওয়া অর্থ দ্রুত চার স্তরের একটি জটিল ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরিয়ে ফেলা হয়। এতে ২০ হাজারের বেশি লেনদেন হয়েছে। পুলিশ ৭৭টি প্রথম স্তরের ব্যাংক হিসাব শনাক্ত করেছে, যেখানে ভুক্তভোগীর অর্থ প্রথমে জমা হয়েছিল। সেখান থেকে অর্থ ৪৯৩টি দ্বিতীয় স্তরের হিসাবে, প্রায় ১২ হাজার ৭০০টি তৃতীয় স্তরের হিসাবে এবং পরে আরও প্রায় ৭ হাজার ৫০০টি লেনদেনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর অর্থ তুলে নেওয়া, ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করা অথবা স্বয়ংক্রিয় টাকা উত্তোলন যন্ত্র, কেনাকাটার ভাউচার ও অনলাইন পরিশোধের মাধ্যমে ব্যয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
এই সাইবার প্রতারণার সূত্র কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, অন্ধ্র প্রদেশ, কেরালা, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খন্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড়সহ একাধিক রাজ্যে ছড়িয়ে রয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, অর্থের উৎস গোপন ও উদ্ধার কঠিন করতে এই চক্রটি ভাড়াটে ব্যাংক হিসাব, ভুয়া প্রতিষ্ঠান এবং সংঘবদ্ধ সাইবার অপরাধী চক্র ব্যবহার করেছে।
রাজ্য সাইবার সেলের উপপুলিশ সুপার সঞ্জীব নয়ন শর্মা বলেছেন, তদন্তকারীরা প্রায় ২ কোটি রুপি জব্দ করেছেন। পাশাপাশি ভুয়া লেনদেনের ওয়েবসাইটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ও ইন্টারনেট প্রোটোকল ঠিকানা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের আওতায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি এই দেশব্যাপী প্রতারণা চক্রের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।




