ইতিহাস বাঁচিয়ে রাখার লড়াই কয়েকজনের
ভারতের কোচিতে ইহুদি ঐতিহ্যের শেষ প্রহর

কেরালার ঐতিহাসিক জিউ টাউনের প্যারাদেসি সিনাগগ। ছবি : আগামীর সময়
পশ্চিম আকাশে তখনো গোধূলির আলো। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছিল কেরালার ঐতিহাসিক জিউ টাউন এলাকায়। মাথায় ধূসর কিপ্পা পরে পাথর বসানো সরু রাস্তা ধরে ৪৫৮ বছরের পুরনো প্যারাদেসি সিনাগগের দিকে হাঁটছিলেন কিথ হ্যালেগুয়া।
সেদিন ছিল ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব শাভুওত। সিনাগগে পৌঁছে তাকে একাই প্রার্থনা করতে হবে। কারণ প্রার্থনার জন্য সেখানে আর কেউ নেই। হ্যালেগুয়াই এখন জিউ টাউনে বসবাসকারী শেষ স্থানীয় ইহুদি।
কোচির অন্য প্রান্তে এরনাকুলামের ১২ শতকের কাডাভুমবাগাম সিনাগগে বসে পুরনো দিনের কথা মনে করছিলেন ৭০ বছরের এলিয়াস ওরফে ‘বাবু’ জোসেফাই। শাভুওতের সময় তার দিদিমা ‘চুক্কুন্ডা’ নামে যে ভাজা মিষ্টি তৈরি করতেন, সেই স্বাদই এখন তার কাছে হারিয়ে যাওয়া এক পৃথিবীর স্মৃতি। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেছেন, ‘খুব বেশি কিছু ছিল না, কিন্তু তখন সেটাই আমাদের কাছে ছিল সব।’
ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বন্দরনগরী কোচিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইহুদি সম্প্রদায়ের বসবাস। ১৯৫০-এর দশকে তাদের বড় একটি অংশ ইসরায়েলে চলে যায়। বাড়ি, উপাসনালয় ও কবরস্থান পড়ে থাকে ভারতে। বর্তমানে গোটা ভারতেই ইহুদির সংখ্যা ৫ হাজারের কম।
পারাদেসি ইহুদিদের পূর্বপুরুষরা ১৬ শতকে স্পেন ও পর্তুগাল থেকে ধর্মীয় নিপীড়ন এড়াতে কোচিতে আসেন। তাদের সঙ্গে আসা দাসদের বংশধররাও পরে ইহুদি সম্প্রদায়ের অংশ হয়ে ওঠেন।
‘মেশুচরারিম’ নামে পরিচিত এই গোষ্ঠীকে দীর্ঘদিন সামাজিকভাবে নিচু চোখে দেখা হতো। ধর্মীয় ক্ষেত্রেও সমান অধিকার পেতে তাদের লড়াই করতে হয়েছে। ফলে কোচির ইহুদি সম্প্রদায়ের ইতিহাস শুধু সম্প্রীতির নয়, এর সঙ্গে সামাজিক বিভাজন ও বৈষম্যের ঘটনাও জড়িয়ে আছে।
অন্যদিকে মালাবারি ইহুদিদের পূর্বপুরুষরা আরও বহু আগে ভারতে এসেছিলেন বলে মনে করা হয়। তাদের ইতিহাস দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। কিংবদন্তি অনুযায়ী, সেই ইতিহাস রাজা সলোমনের সময় পর্যন্ত পৌঁছায়।
গায়ের রঙ তুলনামূলক গাঢ় হওয়ায় অতীতে পারাদেসি ইহুদিদের কাছ থেকেও তাদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সেই বিভাজন অনেকটাই মুছে গেলেও তিক্ত সেই ইতিহাস আজও কোচির ইহুদি সম্প্রদায়ের স্মৃতিতে রয়ে গেছে।
তবে এখন পুরনো বিভাজনের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে তাদের অস্তিত্ব ও ইতিহাস হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
বাবু জোসেফাই বহু বছর ধরে কাডাভুমবাগাম সিনাগগটি পুনর্গঠন করেছেন। ভাঙচুরের পর উদ্ধার করা এই উপাসনালয়ে এখন হাতে তৈরি টাইলস, লাল-সোনালি তোরাহ আর্ক এবং জ্বলন্ত প্রদীপ রয়েছে। স্থানীয় মুসলিমরা দিয়েছেন বাতি, খ্রিস্টানরা দিয়েছেন টেন কম্যান্ডমেন্টসের ফলক এবং একটি হিন্দু সংগঠন দিয়েছে ঝাড়বাতি।
জোসেফাইয়ের প্রতিদিনের দায়িত্ব শুধু ভবনটি রক্ষা করা নয়, একা একা প্রার্থনার ধারাও বজায় রাখা। তার ভাই-বোনেরা ১৯৭২ সালে ইসরায়েলে চলে যাওয়ার পর দিদিমাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিই তাকে এখানে ধরে রেখেছে। তিনি বলেছেন, ‘প্রত্যেক ইহুদির স্বপ্ন থাকে শেষ নিঃশ্বাস ইসরায়েলে নেওয়ার। আমি চাই আমার শেষ নিঃশ্বাস ভারতের এই সিনাগগের ভেতরেই হোক।’
আজকের জিউ টাউন অবশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। একসময় যে সরু রাস্তা দিয়ে ইহুদি পরিবারের মানুষজন সিনাগগে যেতেন, যে বাড়িগুলোয় ছিল তাদের সংসার, সেগুলোর অনেকটাই এখন মশলার গুদাম, পুরনো জিনিসের দোকান কিংবা হস্তশিল্পের বিপণিতে পরিণত হয়েছে। পর্যটকদের আনাগোনাও বেড়েছে। কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্যেই কোথাও যেন হারিয়ে যাওয়া একটি জনপদের স্মৃতি টিকে আছে।
কোচির মশলার বাণিজ্যে একসময় ইহুদিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গোলমরিচ, এলাচ, জয়িত্রী ও জায়ফলের ব্যবসার সঙ্গে তাদের জীবন এবং এই এলাকার অর্থনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল।
সেই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ৪৫৮ বছরের পুরনো প্যারাদেসি সিনাগগ। ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে নীল-সাদা চিনা পোর্সেলিনের টাইলসে মোড়া মেঝে। মাথার ওপর রয়েছে উনিশ শতকের বেলজিয়ান ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি, পাশে রঙিন কাচের বাতি।
পশ্চিম দেয়ালে জেরুজালেমের দিকে মুখ করে রয়েছে খোদাই করা সেগুন কাঠের তোরাহ আর্ক—ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তোরাহ রাখার পবিত্র স্থান। সিনাগগটির স্থাপত্যে তাই শুধু ধর্মীয় ইতিহাস নয়, কোচির সঙ্গে ইহুদি সম্প্রদায়ের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কেরও স্পষ্ট ছাপ রয়েছে।
এই ইতিহাস সংরক্ষণে এখন নতুন উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। চলতি বছর সিনাগগ কর্তৃপক্ষ একটি জাদুঘর খুলেছে। সেখানে কোচির ইহুদি বসতির অতীত ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। রয়েছে প্রায় ১ হাজার খ্রিস্টাব্দের দুটি তাম্রফলক। হিন্দু এক রাজার দেওয়া ওই সনদে কোচিতে বসবাসকারী ইহুদি সম্প্রদায়কে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ বহু শতাব্দী আগেও এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের পাশাপাশি বসবাসের যে ইতিহাস ছিল, তার প্রমাণও এখন সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
এই সংরক্ষণ শুধু ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষ করছেন না। অন্য ধর্মের অনেক স্থানীয় মানুষও ইহুদি ইতিহাসকে নিজেদের ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখছেন।
তাদের একজন হিন্দু এমসি প্রবীণ। জিউ টাউনেই তার শৈশব কেটেছে। হ্যালেগুয়া পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একই স্কুলে পড়েছেন। তাদের বাড়িতে শাবাতের রাতের খাবার খেয়েছেন, সিনাগগের আশপাশে ক্রিকেট খেলেছেন। ফলে ইহুদি সম্প্রদায়ের চলে যাওয়া তার কাছে শুধু একটি জনপদের বদলে যাওয়া নয়, নিজের শৈশবের একটি অংশ হারিয়ে যাওয়াও।
তাই এখন তার লক্ষ্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন এই শহরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষ ও তাদের জীবনযাপনের কথা জানতে পারে।
একই টান অনুভব করেন মুসলিম থাহা ইব্রাহিম। প্রয়াত ইহুদি নারী সারাহ কোহেনকে তিনি ‘সারাহ আন্টি’ বলে ডাকতেন। তার কাছেই শিখেছিলেন কোচির ইহুদি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী সূচিশিল্প। সারাহ কোহেনের মৃত্যুর পর তার সূচিশিল্পের দোকানের দায়িত্বও নিয়েছেন ইব্রাহিম।
প্রতি শুক্রবার তিনি শাবাতের প্রদীপ জ্বালান এবং শনিবার দোকান বন্ধ রাখেন। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা তাকে এই ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি। বরং তিনি বলেছেন, ‘এটা ধর্মের বিষয় নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বিষয়।’
এখন নিজের ছেলেকেও সেই সূচিশিল্প শেখাচ্ছেন তিনি, যাতে সারাহ কোহেনের হাতে তৈরি ঐতিহ্য পরের প্রজন্মেও পৌঁছে যায়।
এই টান শুধু কোচিতে থেকে যাওয়া মানুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ৫৫ বছরের শুলামিত কোটজার মাত্র দুই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে ইসরায়েলে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু ছুটিতে বারবার ফিরে এসেছেন জিউ টাউনে। তার শিকড় যে এখানেই, সেই অনুভূতি এখনও অটুট। ভবিষ্যতে এই এলাকায় একটি হোটেল খোলার স্বপ্নও দেখেন তিনি। তার কাছে কোচি কোনো ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ নয়—এটাই তার নিজের বাড়ি।
আর জিউ টাউনে থেকে যাওয়া কিথ হ্যালেগুয়ার কাছে এই ইতিহাস আরও ব্যক্তিগত। মা ও ভাইয়ের দেখাশোনার দায়িত্বেই মূলত তিনি থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তিনিই হয়ে উঠেছেন এই জনপদের জীবন্ত ইতিহাসের শেষ সাক্ষীদের একজন।
তার মনে এখনও ভেসে ওঠে পারাদেসি ইহুদিদের ধর্মীয় সুরের সঙ্গে মিশে থাকা স্থানীয় লোকগান, মায়ের রান্না করা চিলি চিকেনের গন্ধ, পাসওভারের আগে দিদিমার ঘর পরিষ্কার করার ব্যস্ততা আর রোশ হাশানার নতুন পোশাকের আনন্দ। এসবই এখন তার স্মৃতি। আর তিনি জানেন, তার সঙ্গে হয়তো একদিন এসবও হারিয়ে যাবে।
কখনও কখনও জিউ টাউন ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাও মনে হয় তার। তবু শেষ পর্যন্ত থেকে যান। কারণ এই শহর শুধু তার বসবাসের জায়গা নয়, তার পরিচয়েরও অংশ।
তাই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে হ্যালেগুয়ার কথাটিই যেন কোচির ইহুদি ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর প্রতিধ্বনি—‘আমি ভারতে ইহুদি হয়ে জন্মেছি এবং ভারতেই ইহুদি হয়ে মরব।’








