৪৭ দিন ধরে কলকাতার মুসলিম কলোনিতে পানির সংযোগ নেই

প্রায় ৩,৪৭৮ বর্গমিটার জমির উপর গড়ে ওঠা এই কলোনির জমি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দর কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন।
কলকাতার উত্তরাংশে কাশীপুর-বেলগাছিয়া বিধানসভা কেন্দ্রের জ্যোতিনগর কলোনিতে টানা ৪৭ দিন ধরে পানীয়জলের সংযোগ নেই। ২৯ জুলাই রাতের পর থেকে কলোনির পাঁচটি সরকারি কলে আর পানি আসছে না বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। বিষয়টি আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, আগে প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ওই কলগুলিতে পানি পাওয়া যেত। ২৬ থেকে ২৮ জুলাই কলকাতা পৌরসভার পাইপলাইনের কাজ হয়েছিল এলাকায়। ২৮ জুলাই রাতের পর থেকে পানি বন্ধ হয়ে যায়। বাসিন্দা মহিনুদ্দিন শেখের দাবি, রাস্তা মেরামতের সময় রাতের অন্ধকারে পাইপলাইনের সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তাদের আরও বক্তব্য, জ্যোতিনগর কলোনির আগে এবং পরের এলাকায় থাকা কলগুলিতে পানি মিলছে। মাঝের ওই অংশেই জ্যোতিনগর কলোনি। কলোনির প্রায় ৯৫ শতাংশ বাসিন্দা মুসলিম বলে সেখানকার বাসিন্দারা জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকেই উঠেছে বৈষম্যের অভিযোগ। বাসিন্দাদের দাবি, পানি ও বিদ্যুতের মতো মৌলিক পরিষেবা বন্ধ করে তাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে। কলোনির প্রধান আলমগীর বিশ্বাসের অভিযোগ, পানি-বিদ্যুৎ বন্ধ করে মানুষকে এমন অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা নিজেরাই জায়গা ছেড়ে চলে যান। তার আরও দাবি, জ্যোতিনগরে হিন্দু- মুসলিম দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করছেন এবং এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রয়েছে।
তবে জানা যায় প্রায় ৩,৪৭৮ বর্গমিটার জমির উপর গড়ে ওঠা এই কলোনির জমি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দর কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন। চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি বন্দরের এস্টেট আধিকারিক কলোনির বাসিন্দাদের উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। ১৯৭১ সালের সরকারি সম্পত্তি থেকে বেআইনি দখলদার উচ্ছেদ আইনের আওতায় ওই নির্দেশ দেওয়া হয়।
উচ্ছেদ নিয়ে আইনি লড়াইও চলছে। ১৮ অগস্ট কলকাতার মুখ্য বিচারকের আদালত উচ্ছেদ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেওয়ার আবেদন খারিজ করে। পরেরদিন বাসিন্দারা কলকাতা হাইকোর্টে যান। হাইকোর্ট ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয় বলে প্রশাসন সূত্রে জানা যায় । একই সঙ্গে পানি সংযোগ পুনরুদ্ধারের আবেদনও আদালতে করা হয়েছে, যার নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।
এর মধ্যেই ৯ সেপ্টেম্বর জ্যোতিনগর কলোনিতে যান সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়। তার বক্তব্য, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে পানি কেটে দেওয়া অমানবিক। বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বানও জানান তিনি। স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারি অবশ্য পানি সরবরাহের দায় নিজের উপর নেননি। তার বক্তব্য, জমিটি বন্দরের এবং পানি সরবরাহ কলকাতা পুরসভার বিষয়। তিনি বলেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন, তাই রাজনৈতিক নেতাদের মন্তব্য করা উচিত নয়।
অন্যদিকে বিদ্যুতের সমস্যাও হয়েছিল একই সময়ে। বাসিন্দাদের দাবি, ২৯ জুলাই বিদ্যুৎ সংযোগও বন্ধ হয়েছিল। পরে প্রায় এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনের মধ্যে তা ফের চালু হয়। পানি অবশ্য এখনও পর্যন্ত ফেরেনি। ফলে পাশের এলাকার কল থেকে পানি সংগ্রহ করে, টাকা দিয়ে পুরসভার পানির গাড়ি আনা এবং কখনও গঙ্গার পানি ব্যবহারের মতো পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটছে বাসিন্দাদের। গঙ্গার পানিতে স্নান করে শিশুদের চর্মরোগও হচ্ছে বলে কলোনির মনতুজ আলম বলেন।
একদিকে সরকারি জমিতে বসবাস ও উচ্ছেদ নিয়ে আইনি বিরোধ, অন্যদিকে পাঁচটি কলের দীর্ঘদিন শুকিয়ে থাকা এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবন। আর কলোনির অধিকাংশ বাসিন্দা মুসলিম হওয়ায় ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগও সামনে এসেছে। উচ্ছেদ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া চললেও, তার মধ্যে একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মানুষের পানির মতো মৌলিক পরিষেবা কতদিন বন্ধ থাকতে পারে?



