মমতা যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের অপ্রতিরোধ্য নেতা হয়ে উঠেছিলেন
- মমতার পুরো রাজনৈতিক জীবন প্রমাণ করে তিনি কঠিন বিপদেই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৮৪ সালে প্রথম লোকসভায় নির্বাচিত হন। তখন তার বয়স ছিল ২৯ বছর।
১৯৭৫ সালের সেই উত্তাল ২৫ আগস্ট, পশ্চিমবঙ্গ কাঁপছিল ইন্দিরা গান্ধী সরকারের জারি করা জরুরি অবস্থার ভয়াবহ প্রকোপে। তরুণী মমতা তখন দেখান নিজের সাহসের এক অবিস্মরণীয় ঝলক। জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ি যখন আসছিল কলেজ স্ট্রিটের ছাত্র রাজনীতির সেই চত্বরে, মমতা হুট করে লাফিয়ে ওঠেন চলন্ত গাড়ির বনেটের ওপর। সুতির সাধারণ শাড়ি পরা সেই মেয়েটি সেদিন স্তম্ভিত করে দেন উপস্থিত সব ডাকসাইটে ফটো সাংবাদিকদের। মমতার সেই তেজস্বী রূপ দেখে বিশ্ব সেদিন চিনেছিল বাংলার রাজপথের এক ভবিষ্যৎ লড়াকু নেত্রীকে। রাজপথই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান আর আন্দোলনের প্রধান বিচরণ ক্ষেত্র।
পশ্চিমবঙ্গের এবারের ভোট যুদ্ধে মমতা লড়ছেন এক কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। ৭১ বছর বয়সী এই নেত্রী এখন সামলাচ্ছেন তিন মেয়াদের প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়ার এক প্রবল চাপ। তার দলের বিরুদ্ধে মানুষ ইদানিং তুলছেন বড় বড় সব দুর্নীতির অভিযোগ। বিজেপি এখন নিজেদের সর্বশক্তি বাজি রেখে উল্টে দিতে চাইছে তার মসনদ। তবে মমতার পুরো রাজনৈতিক জীবনই প্রমাণ করে তিনি কঠিন বিপদেই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর। লড়াই যত কঠিন হয়, মমতা তত বেশি গর্জে ওঠেন রাজপথের সেই পুরোনো মেজাজে।
শুরুটা যেভাবে
মমতার সংগ্রামী জীবনের শুরুটা ছিল বড্ড বেশি কষ্টের আর দারিদ্র্যের সঙ্গে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি হারান বাবাকে, অর্থের অভাবে বিনাচিকিৎসায়। সরকারি বিল আটকে থাকায় তার পরিবার তখন পারছিল না মেটাতে বাবার হাসপাতালের খরচ। মৃত্যুর পরদিন বাড়িতে আসা চেক মমতার কাছে ছিল এক চরম উপহাসের মতো।
পাঁচ ভাইবোনের জন্য ভোরে উঠে রান্না সেরে তিনি যেতেন কলেজের ক্লাসে। যখন সহপাঠীরা মেতে থাকত নতুন জামাকাপড়ের নেশায়, মমতা তখন পরতেন অতি সাধারণ এক সুতির শাড়ি। এই সুতির শাড়িই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে মমতার এক অনন্য ব্র্যান্ড ইমেজ সারা বিশ্বের কাছে।
রাজনীতির হাতেখড়ি
স্কুল জীবন শেষ করে মমতা নাম লেখান কলকাতার যোগমায়া দেবী কলেজে। কিশোরী বয়সেই তিনি জেতান কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠনকে কলেজ সংসদের সেই কঠিন নির্বাচনে। তার তেজস্বী মেজাজ দেখে বড় নেতারা তাকে নিয়ে যান দলের কেন্দ্রীয় কমিটির একদম প্রথম সারিতে।
১৯৮৪ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে মমতা হারিয়ে দেন তুখোড় বাম নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে। লোকসভায় প্রবেশের পর তিনি নিজের জয়যাত্রা বজায় রাখেন দক্ষিণ কলকাতা আসন থেকে টানা ২০ বছর। বাংলার মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন কংগ্রেসের এক প্রতিবাদী আর বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর।
কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ভূমিকা
পিভি নরসিংহ রাওয়ের সরকারে মমতা নাম লেখান জুনিয়র মন্ত্রী হিসেবে। কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি বিবাদে জড়ান দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে। রাজ্য কংগ্রেসের নেতাদের তিনি ডাকতেন সরাসরি সিপিএমের পোষা এজেন্ট বলে।
এই মনোমালিন্য যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, মমতা তখন ১৯৯৭ সালে গঠন করেন তৃণমূল কংগ্রেস। বাজপেয়ী সরকারে তিনি সামলান রেল আর কয়লা মন্ত্রণালয়ের মতো বড় সব দায়িত্ব। তেহেলকা কাণ্ডে দুর্নীতির প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন মন্ত্রিসভা থেকে এক মুহূর্তের সিদ্ধান্তে।
রাজপথের লড়াকু যোদ্ধা
রাজপথের লড়াইয়ে মমতা কখনো ভয় পাননি পুলিশের লাঠি কিংবা রক্তচক্ষুকে। ১৯৯২ সালে এক ধর্ষণের শিকার তরুণীকে নিয়ে তিনি যখন ঢোকেন মহাকরণে, পুলিশ তাকে বের করে দেয় চুল ধরে টেনে। সেইদিন তিনি শপথ নিয়েছিলেন যে মুখ্যমন্ত্রী না হওয়া পর্যন্ত পা রাখবেন না ওই ভবনে।
১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই পুলিশের গুলিতে যখন ১৩ জন কর্মী মারা যান, মমতা তখন হয়ে ওঠেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষের চোখের মণি। ১৯ বছর পর ২০১১ সালে তিনি ঠিকই পূরণ করেন সেই কঠিন প্রতিজ্ঞা। মমতার এই হার না মানা জেদই তাকে পৌঁছে দেয় সাধারণ মানুষের মনের মণিকোঠায়।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম অধ্যায়
সিঙ্গুর আর নন্দীগ্রামের আন্দোলন মমতার রাজনৈতিক জীবনকে ঘুরিয়ে দেয় এক নতুন মোড়ে। টাটাদের কারখানার বিরুদ্ধে তিনি বসে থাকেন টানা ২৬ দিন অনশনে শরীরের মায়া ত্যাগ করে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আর প্রধানমন্ত্রী তাকে চিঠি পাঠান নিজের জীবনের ঝুঁকি না নিতে।
নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলিতে যখন গ্রামবাসী মারা যান, মমতা তখন দাঁড়িয়ে থাকেন মানুষের ঢাল হয়ে। এই আন্দোলনের জোয়ারেই তিনি উপড়ে ফেলেন বামেদের সেই দীর্ঘ তিন দশকের শক্ত ঘাঁটি। সিঙ্গুর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করে মমতার সেই আপসহীন লড়াইয়ের যথার্থতা।
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে গত ১৫ বছরে মমতা নিজেকে গড়েছেন একদম সাধারণ ঘরের এক দিদি হিসেবে। তিনি আদিবাসী পাড়ায় গিয়ে হাত মেলান নাচের তালে আর কথা বলেন একদম আপন মানুষের মতো। কলকাতার বাবুরা একে নাক সিটকালেও গ্রামের সাধারণ মানুষ তাকে দেখেন নিজের ঘরের মেয়ে হিসেবে।
‘কন্যাশ্রী’ আর ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি জয় করেছেন বাংলার নারী ভোটারদের মন। তবে দুর্নীতি আর শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি ইদানীং বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে তার সাজানো সংসারকে। আরজি করের সেই ন্যক্কারজনক ঘটনাও দেশজুড়ে তুলেছে মমতার প্রশাসনের দিকে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন। ২০২৬ এর নির্বাচন
মমতা অবশ্য দাবি করেন কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলো করছে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে ভোটার তালিকা নিয়ে তিনি লড়াই করছেন কমিশনের সাথে একদম মুখোমুখি। নিজের এক সময়ের সহযোদ্ধারা এখন তার প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছেন নির্বাচনী এই রণক্ষেত্রে। কিন্তু মমতা হাল ছাড়ার পাত্রী নন বলেই তিনি আবার নেমে পড়েছেন রাজপথের মিছিলে।
আজ ৪ মে সারা দেশের চোখ এখন বাংলার এই রুদ্ধশ্বাস ফলাফলের ওপর। লড়াইটা সহজ না হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়বেন নিজের এই প্রিয় বাংলার জন্য।









