‘চৈত-বৈশাখের ডিমে, রুই-কালবাউশ বেশি মেলে’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আনোয়ার হোসেনের বয়স ৬২ বছর। হালদা নদী ঘিরে তার জীবন-জীবিকা ছোটবেলা থেকে, অর্ধশতাব্দীকালের। সারা বছর আজিমের ঘাট এলাকায় খেয়া পারাপার করেন। আর চৈত্র মাস থেকে নদীপানে চেয়ে থাকেন ডিমের আশায়। এ অপেক্ষা কখনো কখনো জ্যৈষ্ঠ মাস পার হয়ে যায়। এবার বাড়েনি। বৈশাখী পূর্ণিমার জো-তে হালদার মা মাছ ডিম ছেড়েছে। এতে দারুণ খুশি রাউজানের আনোয়ার, ‘চৈতের আণ্ডা (ডিম), বৈশাখের ছা (মাছের রেণু) হলো সবচেয়ে ভালো। এ সময়ের পোনা সবল এবং হৃষ্টপুষ্ট হয়।’
এর আগে ঠিক কবে বৈশাখী পূর্ণিমার জো-তে মাছ ডিম ছেড়েছিল, তা আনোয়ার মনে করতে পারছেন না। তবে মদুনাঘাট সরকারি হ্যাচারিতে উপস্থিত হারেছ আহমেদ ও শাহেদ সমস্বরে জানালেন, ‘দুই দশক পর এমন ঘটনা ঘটল। চৈত-বৈশাখের ডিমে রুই, কালবাউশ বেশি মেলে।’
ডিম দিয়েছে গত বৃহস্পতিবার। এরপর ডিম থেকে রেণু ফোটানোর উপযুক্ত পরিচর্যায় ব্যস্ত ডিম সংগ্রহকারীরা। রেণু ফুটেছে। আগামীকাল থেকে শুরু হবে বিক্রি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীরা যোগাযোগ করছেন স্থানীয় ডিম সংগ্রাহক বা রেণু উৎপাদনকারীদের সঙ্গে। হালদা হলো দেশের একমাত্র মিঠাপানির প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র, যা চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত।
বৈশাখ মাসের ডিম, রেণুর গুণাগুণ সর্বোপরি চাহিদার তুলনায় কম ডিম; সব মিলিয়ে এবার দাম ভালোই মিলবে এমন আশা তাদের। ছয় হাজার কেজি ডিম মিলেছে এবার। গতবারের অর্ধেক। তাই তো ডিম থেকে রেণু ফোটানো ও বাঁচিয়ে রাখার কাজ করে চলেছে সতর্কতার সঙ্গে। ঠিক যেন মায়ের পরিচর্যা। চলুন মদুনাঘাট ও শাহ মাদারী হ্যাচারিতে একবার দেখে আসি ডিম সংগ্রহ থেকে রেণু ফোটার প্রক্রিয়াটি।
হালদা নির্ভরশীল কিছু মৎস্যজীবী রয়েছেন। তাদের দু-একজন বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে প্রথম টের পান মা মাছের ডিম দেওয়ার বিষয়টি। সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই দফায় সাধ্যমতো ডিম সংগ্রহ করেন অন্তত ৫০০ সংগ্রহকারী। রাতের মধ্যে ডিম নিয়ে যাওয়া হয় রাউজান ও হাটহাজারীর ছয়টি হ্যাচারিতে। হ্যাচারির পাকা ও ফাইবারের হ্যাচে পানি দিয়ে তা ছোট ছিদ্রযুক্ত জাল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। জালের ওপর ডিম রাখা হয়।
সকাল হতে হতে— অর্থাৎ দ্বিতীয় দিনে ডিমের খোলসের ভেতর তা আস্তে আস্তে নড়াচড়া শুরু করে। অনেকটা মায়ের গর্ভে নড়াচড়ার যে চিত্র আলট্রাসনোগ্রাফিতে দেখা যায়, সেরকম। ডিমের খোলস থেকে ফুটে একেবারে সূক্ষ্ম সুতার মতো রেণু ঝরে পড়ে হ্যাচের পানিতে, যেন প্রাণ প্রতিষ্ঠা! দেখতে সুতার মতো এসব রেণুর চোখ ফোটেনি তখনো।
এর মধ্যে হ্যাচের পানি পরিবর্তনের দরকার পড়ে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে অতি সযত্নে একেবারে সূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত সাদা কাপড় দিয়ে বিদ্যমান হ্যাচ থেকে রেণুগুলোকে ছেঁকে নেয়। কাপড়ের মধ্যে অল্প পানিসহ তা নতুন পানিভর্তি হ্যাচে ফেলা হয়। তৃতীয় দিনে রেণুর চোখ ফোটে। সে হিসাবে শনিবার চোখ ফুটেছে হালদার এবারের রেণুর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আকারেও বড় হতে থাকে।
চোখ ফোটার হাসি ছড়িয়ে পড়েছে শাহ মাদারী হ্যাচারি সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইলিয়াছের চোখেমুখে, ‘আমার এখানে প্রায় দুই হাজার কেজি ডিম এসেছে। ডিম থেকে দ্বিতীয় দিনে রেণু হয়। তৃতীয় দিনে রেণুর চোখ ফোটে। আজ চতুর্থ দিনে খাবার দেওয়া হবে, মুরগি বা হাঁসের ডিমের সিদ্ধ করা কুসুম। আর পঞ্চম দিন থেকে বিক্রি শুরু হবে। এবার ডিম কম মিললেও বৈশাখের রেণু হিসেবে কোয়ালিটি ভালো। ব্যবসায়ীরা যোগাযোগ শুরু করেছেন। কাল থেকে বিক্রি।’
এক কেজি ডিম থেকে তিন লাখের বেশি রেণু হয়। সেখান থেকে দুই লাখ পর্যন্ত টেকে। এবারের ছয় হাজার কেজি ডিম থেকে রেণু মিলবে প্রায় ১৫০ কেজি। আজ রবিবার বিকেল থেকে রেণু গণনা শুরু করবে মৎস্য অধিদপ্তর। এবার প্রতি কেজি রেণু ১ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রির আশা সংগ্রহকারীর। সে হিসাবে প্রায় ২ কোটি টাকার লেনদেন হতে পারে বলে জানালেন ইলিয়াছ।
হাটহাজারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শওকত আলী জানালেন, এবার যথাযথ সময়ে ডিম দিয়েছে। সামনের পূর্ণিমায় আবারও ডিম দেওয়ার একটা সম্ভাবনা রয়েছে। ডিম থেকে যেভাবে নিরলস চেষ্টায় রেণু ফোটানোর কাজটি সরকারি সহযোগিতায় জেলেরা করেন, তা এককথায় অভূতপূর্ব।



