সময় চলতে পারে উল্টো পথেও, মেনে নিচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞানও

এই ফলাফল থেকে পরিষ্কার হয়, ‘নেগেটিভ সময়’ কোনো ভ্রম বা কেবল গাণিতিক কৌশল নয়; এটি বাস্তব এবং পরিমাপযোগ্য একটি কোয়ান্টাম প্রভাব। তবে এর অর্থ এই নয় যে আমরা সময় ভ্রমণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। ছবি: এইচ.জি. ওয়েলসের লেখা টাইম মেশিন থেকে নির্মিত চলচ্চিত্রের দৃশ্য
প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্যে হোমার যে ওডিসিউসের দীর্ঘ যাত্রার কথা বলেছেন- ট্রয় থেকে ইথাকায় ফেরার সেই অসম্ভব অভিযাত্রা; তা কেবল গল্পেই সম্ভব বলে মনে হয়। বাস্তবে কেউ যদি দাবি করে যে সে কোথাও ‘ঋণাত্মক সময়’ কাটিয়েছে, তা নিছক রসিকতাই মনে হবে। কিন্তু কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের জগতে ঠিক এমনই এক অদ্ভুত বাস্তবতার সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা।
সাম্প্রতিক এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, আলোর কণা ফোটন কখনও কখনও এমন আচরণ করে যেন তারা কোনো মাধ্যমে শূন্যেরও কম সময় অবস্থান করেছে।
এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস জার্নালে। যেখানে ফোটন ও রুবিডিয়াম পরমাণুর মিথস্ক্রিয়া নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়। রুবিডিয়াম পরমাণুর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, নির্দিষ্ট শক্তির ফোটন তাদের সঙ্গে ‘রেজোন্যান্স’ তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ ফোটনের শক্তি সাময়িকভাবে পরমাণুর মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে তাকে উত্তেজিত অবস্থায় নিয়ে যায়, তারপর আবার ফোটন হিসেবে বেরিয়ে আসে। এই প্রক্রিয়ায় মনে করা হয়, ফোটন কিছু সময়ের জন্য পরমাণুর মধ্যে ‘অবস্থান’ করে।
তবে এখানে কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। যদি ফোটনের শক্তি খুব নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়, তাহলে তার সময় সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বেড়ে যায়। ফলে ফোটন ঠিক কখন পরমাণুর মেঘে প্রবেশ করছে, তা নির্ভুলভাবে জানা যায় না- শুধু গড় সময় নির্ধারণ করা সম্ভব। সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, ফোটন আলোর বেগে চললে যে সময়ে মেঘের এক পাশ থেকে অন্য পাশে পৌঁছানোর কথা, সেটাই হবে তার আগমনের সময়।
কিন্তু পরীক্ষায় দেখা গেল, যদি কোনো ফোটন ছড়িয়ে না পড়ে সরাসরি মেঘ ভেদ করে বেরিয়ে আসে, তাহলে সে প্রত্যাশিত সময়ের অনেক আগেই পৌঁছে যায়। এতটাই আগে যে হিসাব করলে মনে হয়, ফোটনটি মেঘের ভেতরে ‘ঋণাত্বক সময়’ কাটিয়েছে- অর্থাৎ সে যেন বেরিয়েছে ঢোকার আগেই।
এই অদ্ভুত পর্যবেক্ষণ নতুন নয়; ১৯৯৩ সালের এক পরীক্ষাতেও এমন ফল পাওয়া গিয়েছিল। তবে তখন অনেক পদার্থবিদ এটিকে একটি ভ্রম বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
তাদের মতামত ছিল, দীর্ঘ আলোক-পালসের কেবল সামনের অংশটি পার হয়ে যায়, আর বাকিটা ছড়িয়ে পড়ে, ফলে মনে হয় ফোটন আগেই পৌঁছে গেছে।
কিন্তু এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট ছিলেন না গবেষক অ্যাফ্রেইম স্টেইনবার্গ। তিনি জানতে চাইলেন, যদি সরাসরি পরমাণুগুলোর আচরণ দেখে বোঝা যায় ফোটন কতক্ষণ তাদের মধ্যে ছিল, তাহলে কী পাওয়া যাবে।
সমস্যা হলো, কোয়ান্টাম জগতে কোনো কিছু পরিমাপ করতে গেলে সেটিকে বিঘ্নিত করতেই হয়। খুব নির্ভুলভাবে মাপতে গেলে ফোটন ও পরমাণুর স্বাভাবিক পারস্পরিক ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যাকে বলা হয় কোয়ান্টাম জেনো প্রভাব।
এই বাধা কাটাতে গবেষকরা ব্যবহার করেন ‘উইক মেজারমেন্ট’ বা দুর্বল পরিমাপ পদ্ধতি। এতে খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়, যাতে সিস্টেমের ওপর প্রভাব ন্যূনতম থাকে। তারা একটি দুর্বল লেজার রশ্মি পরমাণুর মেঘের মধ্য দিয়ে পাঠান এবং সেই রশ্মির ফেজে ক্ষুদ্র পরিবর্তন মেপে বোঝার চেষ্টা করেন, পরমাণুগুলো উত্তেজিত হয়েছে কি না।
একেকটি মাপে ফলাফল খুব অস্পষ্ট হলেও, লক্ষ লক্ষ বার পরীক্ষা চালিয়ে গড় করলে একটি নির্ভুল মান পাওয়া যায়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই পদ্ধতিতে মাপা ফোটনের অবস্থানকাল ঠিক সেই ‘ঋণাত্বক সময়’-এর সমান পাওয়া যায়, যা আগেই তার আগমনের সময় থেকে অনুমান করা হয়েছিল। অর্থাৎ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতি- একটি ফোটনের আগমনের সময় দেখে, আরেকটি পরমাণুর ভেতরের অবস্থা দেখে- একই অদ্ভুত ফলাফল দিচ্ছে।
এই ফলাফল থেকে পরিষ্কার হয়, ‘নেগেটিভ সময়’ কোনো ভ্রম বা কেবল গাণিতিক কৌশল নয়; এটি বাস্তব এবং পরিমাপযোগ্য একটি কোয়ান্টাম প্রভাব। তবে এর অর্থ এই নয় যে আমরা সময় ভ্রমণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। পুরো ঘটনাটি প্রচলিত কোয়ান্টাম তত্ত্ব দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়।
তবুও এই গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোয়ান্টাম জগতের বাস্তবতা আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সবসময় মেলে না। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার আচরণ কখনও কখনও এমন বিস্ময় তৈরি করে, যা আমাদের ধারণার সীমা চ্যালেঞ্জ করে।
ওডিসিউসের মতোই, এই বৈজ্ঞানিক অভিযাত্রাও এখনও শেষ হয়নি- বরং সামনে আরও অজানা রহস্য অপেক্ষা করছে উন্মোচনের জন্য।


