বারুইপুরে নাবালিকা গণধর্ষণ ও খুন, পুলিশের গুলিতে প্রধান অভিযুক্ত প্রভাস নিহত

পুলিশের গুলিতে প্রধান অভিযুক্ত প্রভাস নিহত। ছবি : আগামীর সময়
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বারুইপুরের মুসলিম নাবালিকাকে গণধর্ষণ ও নৃশংসভাবে খুনের মামলার তদন্তে বুধবার ভোররাতে বড় মোড় এলো। ঘটনাস্থলে তদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হলো মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের। পুলিশের দাবি, তদন্তের স্বার্থে তাকে সূর্যপুর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে আচমকা পালানোর চেষ্টা করে সে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়েই গুলি চালাতে বাধ্য হন পুলিশকর্মীরা।
তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, নাবালিকার নিখোঁজ হওয়ার পর বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে প্রভাস মণ্ডলকে শনাক্ত করা হয়। একাধিক ফুটেজে তাকে নাবালিকার সঙ্গে দেখার পর সন্দেহের তির ঘুরে যায় তার দিকে। পরে গ্রেপ্তারের পর জেরায় পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পুকুর থেকে উদ্ধার হয় নাবালিকার বস্তাবন্দি মরদেহ।
পুলিশের বক্তব্য, বুধবার ভোরে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য প্রভাসকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেসময় সে এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং পালানোর উদ্দেশে তৎপর হয়। তদন্তকারী দলের দাবি, পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠায় আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
এ মামলায় মোট গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তরা হলেন আনন্দ সর্দার, দিবাকর সর্দার ও প্রভাস মণ্ডল সহ আরও একজন। তদন্তকারীরা মনে করছেন, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে অপরাধের সম্পূর্ণ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। ঘটনার পর থেকেই বারুইপুর ও আশপাশের এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের একাংশ দ্রুত ও কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
অনেকেই পুলিশের পদক্ষেপকে সমর্থন করে লিখেছেন, ‘এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা যাওয়া প্রয়োজন।’ তবে অন্য একটি অংশের মত, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ যতই গুরুতর হোক, বিচারব্যবস্থার মধ্য দিয়েই শাস্তি হওয়া উচিত। আদালতের রায় ঘোষণার আগেই কোনো অভিযুক্তকে এনকাউন্টার করা উচিত নয়।
অন্যদিকে পুলিশের গুলিতে মৃত অভিযুক্ত প্রভাসের মা বলেছেন, মায়ের তো কষ্ট হবেই। ও যা কর্ম করেছে, তাতেই গিয়েছে। আমার শান্তি। ও যা করেছে, ওর যে মৃত্যু হয়ে গিয়েছে আমার শান্তি। মৃতদেহ আমি আনব না। আর আমি দেখতে চাই না। ওকে নিয়ে যা খুশি করুক, আমরা কেউ যাব না। ও আমাদের কথা শোনেনি। মায়ের কথা শোনেনি। নেশা করত। গণধর্ষণের পরে গলায় পা দিয়ে চেপে, পুকুরের জলে ছুড়ে ফেলে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে বারুইপুরের ১১ বছরের মুসলিম মেয়েকে।
এদিকে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে অশান্তি ছড়িয়েছিল, তার জেরেও কড়া অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। পুলিশের ওপর হামলা, ভাঙচুর ও উত্তেজনা ছড়ানোর অভিযোগে এখনো পর্যন্ত অন্তত ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, আইন হাতে তুলে নেওয়ার কোনো চেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না।
তবে বারুইপুরকাণ্ডে অভিযুক্তের এনকাউন্টার নিয়ে বহু বুদ্ধিজীবীদের মতে, উত্তরপ্রদেশে বহুল আলোচিত ‘এনকাউন্টার মডেল’-এর ছায়া এবার বাংলার আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাতেও দেখা যাচ্ছে। মানবাধিকারকর্মীদের অনেকেরই বক্তব্য, অপরাধ যতই জঘন্য হোক না কেন, সংবিধান প্রত্যেক অভিযুক্তের আইনি বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করে।
তাদের আশঙ্কা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকে যদি অপরাধ দমনের উপায় হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে ভবিষ্যতে আইনের শাসনের বদলে পুলিশি ক্ষমতাই প্রধান হয়ে উঠতে পারে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, এনকাউন্টারের প্রতিটি ঘটনাতেই নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি, যাতে বোঝা যায় পুলিশের বলপ্রয়োগ সত্যিই অনিবার্য ছিল কি না। একই সঙ্গে অপরাধীদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা অটুট রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।




