এবার কলকাতায় ১৩৬ বছরের প্রাচীন মসজিদ ঘিরে বিতর্ক

কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে অবস্থিত গৌরীপুর জামে মসজিদ। ছবি : আগামীর সময়
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানীর কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে অবস্থিত ১০০ বছরের পুরনো গৌরীপুর জামে মসজিদকে কেন্দ্র করে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা। বিমান চলাচলের নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে মসজিদটি স্থানান্তরের প্রস্তাব সামনে আসতেই বিষয়টি প্রশাসনিক মহল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। তবে এই বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিমানবন্দরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, স্থানীয় মানুষের আবেগ এবং দীর্ঘদিনের সম্প্রীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বর্তমানে বিমানবন্দরের সীমানার মধ্যে থাকা এই মসজিদটি স্থানীয়ভাবে ‘বাঁকড়া মসজিদ’ নামেও পরিচিত। জানা যায়, মসজিদটির বয়স প্রায় ১৩৬ বছর। বিমানবন্দর তৈরির বহু আগেই এটি নির্মিত হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় ধরে এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে রয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, রানওয়ের একেবারে কাছাকাছি অবস্থানের কারণে মসজিদটি নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিমান ওঠানামার এলাকায় বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনা প্রয়োজন হয়। সেই কারণেই বহু বছর ধরে মসজিদটি স্থানান্তরের বিষয়টি আলোচনা হয়েছে।
বিমানবন্দর সূত্রের দাবি, গত কয়েক দশকে একাধিকবার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবারও প্রশাসন, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং মসজিদ কমিটির প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক শুরু হয়েছে। একটি বিশেষজ্ঞ দলও এলাকা পরিদর্শন করে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছে বলে জানা গিয়েছে।
তবে এই বিতর্কের মধ্যে বারবার উঠে আসছে একটি ঐতিহাসিক তথ্য। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, বিমানবন্দর গড়ে ওঠার সময় এলাকার মুসলিম সমাজ বিমানবন্দর নির্মাণে প্রয়োজনীয় জমি দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। মসজিদ সংলগ্ন বিস্তীর্ণ জমির একটি অংশ বিমানবন্দর প্রকল্পের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। সেই কারণে অনেকের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করতে গেলে এই ইতিহাসকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে গৌরীপুর অঞ্চলে মসজিদটি নির্মিত হয়। পরে ব্রিটিশ আমলে বিমানবন্দর তৈরির কাজ শুরু হলে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা অধিগ্রহণ করা হয়। বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের বিভিন্ন পর্যায়েও মসজিদটি অক্ষত থাকে এবং ধীরে ধীরে বিমানবন্দরের সীমানার মধ্যে চলে আসে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, নিরাপত্তার প্রয়োজন ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য আনা সম্ভব। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে যে, কোনও ধরনের জোরপূর্বক পদক্ষেপ নেওয়া হবেনা বরং পুরো বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মসজিদ কমিটির সদস্যদের বক্তব্যও তুলনামূলকভাবে সংযত। তাদের মতে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। তবে একই সঙ্গে শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা এবং ওয়াকফ সম্পত্তির সঙ্গে বহু মানুষের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। তাই স্থানীয় মানুষ ও ধর্মীয় মহলের মতামত নিয়ে তবেই কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।
সূত্রের খবর, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিকল্প সমাধান হিসেবে কাছাকাছি এলাকায় নতুন ও বৃহত্তর মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। সেই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। দমদমের এই মসজিদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এলাকার ইতিহাস এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের দীর্ঘ সহাবস্থানের স্মৃতি। ফলে বিষয়টির সমাধানও এমন হওয়া প্রয়োজন, যেখানে নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা যেমন গুরুত্ব পাবে, তেমনই সম্মান জানানো হবে এলাকার ঐতিহ্য ও মানুষের অনুভূতিকেও।
মসজিদ কমিটির সদস্য আবুল কালামের মতে, ‘বিমানবন্দরের কাজকর্মে কোনও সমস্যা হোক সেটা আমরা চাই না। কর্তৃপক্ষ নতুন মসজিদ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এই মসজিদের সাথে বহু মানুষের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। তাই একা আমরা কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। সবাইকে নিয়ে আলোচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ হবে।’
অন্যদিকে জমিয়তে উলেমা-ই-হিন্দের রাজ্য সভাপতি সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। সরকার, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে আলোচনা করেই সমাধানের পথ বের করতে হবে আমাদের।’
আবার বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘রানওয়ের খুব কাছে মসজিদটির অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনার বিষয়। জরুরি পরিস্থিতিতে এটি ঝুঁকির কারণ হতে পারে। সেই দিকটি মাথায় রেখেই বিকল্প সমাধান নিয়ে আমাদের আলোচনা চলছে।’
এ বিষয়ে উত্তর দমদমের বিজেপি বিধায়ক (সাংসদ) সৌরভ শিকদার বলেছেন, ‘বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ এবং নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। বিকল্প জায়গায় মসজিদ তৈরির সুযোগ দেওয়া হলে সব পক্ষের সহযোগিতায় সমাধান সম্ভব।’
তবে অনেক স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বিষয়টিকে শুধুমাত্র নিরাপত্তা বা ধর্মের প্রশ্ন হিসেবে না দেখে ইতিহাস, উন্নয়ন এবং পারস্পরিক সম্মানের জায়গা থেকে সমাধান খোঁজা প্রয়োজন। কারণ আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে পাওয়া গেলে তা শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যার নিষ্পত্তিই করবে না বরং তা উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবেও থাকতে পারে।






