জাতিসংঘের ৮০ বছরের পুরনো কাঠামো বদলের ডাক ভারতের

জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত হরিশ পারভাথানেনি
চলমান আন্তর্জাতিক সংঘাত, যুদ্ধ এবং মানবিক সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের বর্তমান কাঠামো যে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না, সেই বার্তাই আবারও স্পষ্টভাবে তুলে ধরল ভারত। নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি সংস্কার, সাধারণ পরিষদকে আরও কার্যকর করে তোলা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের ভূমিকা শক্তিশালী করার পক্ষে সওয়াল করে জাতিসংঘ ব্যবস্থার ব্যাপক পুনর্গঠনের দাবি জানাল নয়াদিল্লি।
মঙ্গলবার (স্থানীয় সময়) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধীনে ‘মেকিং মাল্টিল্যাটারালিজম ফিট ফর দ্য ফিউচার’ শীর্ষক মন্ত্রী পর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই অবস্থান স্পষ্ট করেন জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত হরিশ পারভাথানেনি। ‘প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার’-এর অগ্রগতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত বৈঠকে তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতের উপযোগী বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
ভারতের প্রতিনিধি জানান, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের ব্যাপক সংস্কার এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং টেকসই উন্নয়নের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত তিনটি ক্ষেত্রেই আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ এর ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের কথাও তুলে ধরেন পারভাথানেনি। তার বক্তব্যে উঠে আসে, চলমান বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে কার্যকর হস্তক্ষেপ করতে না পারার কারণে সংস্থাটির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদ বহু ক্ষেত্রেই সংঘাত থামাতে কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ লাঘবে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ভারতের প্রতিনিধি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘ সম্পর্কে জনমানসে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ নিরাপত্তা পরিষদের অকার্যকারিতা। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলতে থাকা সংঘর্ষে অর্থবহ হস্তক্ষেপের অভাব এবং মানবিক সংকট প্রশমনে ব্যর্থতা। এই পরিস্থিতির জন্য তিনি পরিষদের পুরনো সাংগঠনিক কাঠামোকেই দায়ী করেন।
হরিশ পারভাথানেনির বক্তব্য, ১৯৪০-এর দশকের বাস্তবতায় নির্মিত একটি কাঠামো বর্তমান বিশ্বের জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য উপযুক্ত নয়। নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও তা এখনও বাস্তব ফলাফলে পৌঁছায়নি। আন্তঃসরকারি আলোচনার (আইজিএন) কাঠামোর মধ্যে বছরের পর বছর বিবৃতি ও আলোচনার চক্র চললেও প্রয়োজনীয় অগ্রগতি হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার কথায়, এই অচলাবস্থা আর মেনে নেওয়া যায় না; পরিবর্তন অনিবার্য।
‘প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার’ প্রসঙ্গেও ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন তিনি। পারভাথানেনি জানান, আন্তঃসরকারি আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু কর্মসূচি নিয়ে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত মত ছিল। কারণ সংশ্লিষ্ট অংশগুলি প্যাক্টের সহ-সমন্বয়কারীদের বদলে তৎকালীন আইজিএন সহ-সভাপতিদের দ্বারা প্রস্তুত করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও গঠনমূলক মনোভাব থেকেই ভারত এই চুক্তিকে সমর্থন করেছে। শুধু জাতিসংঘ নয়, আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও জোর দিয়ে তুলে ধরে ভারত। পারভাথানেনি বলেন, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত, সাশ্রয়ী এবং পূর্বানুমানযোগ্য অর্থায়ন অপরিহার্য। সেই লক্ষ্য পূরণে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও প্রতিনিধিত্বমূলক, দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম এবং উন্নয়নমুখী হতে হবে, তবে তাদের মূল দায়িত্ব ও উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ণ রেখেই।
বক্তব্যের শেষে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কারের প্রতি ভারতের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেছেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান-সহ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী করে তুলতে যে কোনো আন্তরিক উদ্যোগকে ভারত সমর্থন করবে।
এএনআই থেকে অনূদিত। ভাষান্তর: রুবাইয়া জেসমিন




