ছায়া আর বাতাসের খোঁজে মানুষ

সকাল ৬টা। কিন্তু ভারতের উত্তরপ্রদেশের বান্দার আকাশ দেখে মনে হয় যেন ভরদুপুর। জেলাটি দেশের সবচেয়ে উত্তপ্ত স্থানও বটে। গত মাসের শেষদিকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডের শীর্ষে ছিল এই ধূলিময় জায়গা। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে তাপমাত্রা ছিল ৪৭ থেকে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে। আগুনের মতো আকাশ আর তপ্ত মাটির মাঝখানে পড়ে এখন শুধু একটু ছায়া আর বাতাসের খোঁজেই নিজেদের সব শক্তি ব্যয় করছে বান্দার মানুষ। বিবিসি।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো— এখানকার মানুষের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। বান্দার বাসিন্দা ২০ লাখেরও বেশি। যাদের বড় অংশই কৃষি, নির্মাণ বা পরিবহনের মতো খোলা আকাশের নিচের কাজের ওপর নির্ভরশীল। তাদের এই গরম সহ্য করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাই তারা গরমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের জীবনযাত্রাকে সাজিয়ে নিচ্ছেন নতুন করে।
ভোরের আলো ফুটতেই কৃষকরা টমেটো, লাউ, মরিচ, লেবু ও তরমুজ নিয়ে হাজির হন বাজারে। তীব্র গরম পড়ার আগেই সবাই দ্রুত পণ্য বিক্রি করে বাড়ি ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। কারণ এই আবহাওয়ায় এগুলো টিকবে না বেশি সময়। সকাল ১০টা বাজতে না বাজতেই পুরো বাজার প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়। গরমের এই অর্থনৈতিক প্রভাব এখন সবখানেই দৃশ্যমান।
রান্না করা সবজি দুপুর হতে হতেই নষ্ট হয়ে যায়। ই-রিকশাচালকরা দুপুরবেলা কোনো যাত্রীই পান না। দোকানিরা সূর্য ওঠার আগেই দোকান খোলেন এবং দুপুর থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বন্ধ রাখেন। ক্রেতার সংখ্যাও অর্ধেকে নেমে এসেছে। রোদের তীব্রতা যখন সবচেয়ে বেশি থাকে, তখন পুরো শহর যেন ঘরের ভেতর গুটিয়ে যায় এবং সন্ধ্যা নামলেই আবার বাইরে বের হন মানুষ। তীব্র তাপপ্রবাহের বিষয়ে সতর্ক করে মানুষের মোবাইল ফোনে বারবার সরকারি বার্তা আসছে। সতর্ক ও সাবধানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এতে।
স্থানীয় হাসপাতালগুলোয়ও তাপজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর ভিড় বাড়ছে। যাদের বেশিরভাগই শিশু ও বয়স্ক। ডায়রিয়া, বমি এবং জ্বরই হলো সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গ। বান্দার মানুষের এই গরমের সঙ্গে লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে কেন নদী। গবেষকরা বলছেন, বালু উত্তোলন এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় চারপাশের পরিবেশকে শীতল করার ক্ষমতা হারিয়েছে নদীটি। এর ফলে পানির অভাব এবং চরম তাপমাত্রা মিলে একটি দুষ্টচক্র তৈরি করেছে, যা পরিস্থিতিকে করে তুলছে আরও ভয়াবহ। গাছপালার পরিমাণ প্রয়োজনীয় স্তরের চেয়ে অনেক নিচে নেমে যাওয়াও আরেকটি কারণ। বান্দা কৃষি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, ১৯৯১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জেলার প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ ঘন বনভূমি হারিয়ে গেছে। যার প্রধান কারণ খনি খনন এবং কৃষির বিস্তার।
বান্দার এই দুরবস্থা মূলত একটি বৃহত্তর প্রবণতারই স্থানীয় রূপ। ভারত জুড়ে এখন শুধু উচ্চ তাপমাত্রাই নয়, বরং গরম ও আর্দ্রতার এক ভয়ংকর সংমিশ্রণ দেখা যাচ্ছে, যা আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করছে মানবদেহের ওপর। উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমিকে (যার মধ্যে উত্তরপ্রদেশও অন্তর্ভুক্ত) বিপজ্জনক আর্দ্র গরমের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম উদীয়মান ‘হটস্পট’ হিসেবে বিবেচনা করছেন জলবায়ু গবেষকরা। বান্দায় রাতের তাপমাত্রাও ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে থাকে। ফলে শরীর জুড়ানোর আর সময় পান না মানুষ।




