বাইন্যান্সে ৬৩০ কোটি ডলার উধাও
যেভাবে ঘটল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো চুরি, পেছনে কারা

ছবি: রয়টার্স
ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স থেকে ৬৩০ কোটি ডলার চুরির ঘটনা কীভাবে ঘটেছে, তা তদন্ত করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এটিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হ্যাকিং’ বলে বর্ণনা করা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে হামলার পেছনে পাওয়া গেছে উত্তর কোরিয়ার একটি হ্যাকার গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত।
আগের বড় ক্রিপ্টো চুরির ঘটনাগুলোর তুলনায় এবারের চুরির পরিমাণ অনেক বেশি। এর আগে বাইবিট থেকে ১৫০ কোটি ডলার, পলি নেটওয়ার্ক থেকে ৬১ কোটি ডলার এবং রনিন নেটওয়ার্ক থেকে ৫৪ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছিল।
অক্টোবর মাসে ধারাবাহিক সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের সর্বশেষ ঘটনা এটি। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশের মতে, দুর্বলতা শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এসব হামলার অন্যতম কারণ।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্সের নিয়ন্ত্রণে মোট ক্রিপ্টো বাজারের প্রায় ৩৫ শতাংশ। ক্রিপ্টো ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি মানুষকে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচার সুযোগ দেয়।
প্রচলিত মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানের মতো বাইন্যান্সও গ্রাহকদের ক্রিপ্টোকারেন্সি নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ওয়ালেটে সংরক্ষণ করে। এসব ওয়ালেটের মধ্যে কয়েকটি সব সময় অনলাইনে সক্রিয় থাকে। সেখান থেকেই গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
হামলাটি চার ঘণ্টারও কম সময়ে ঘটে। হ্যাকাররা একটি হ্যাক হওয়া ল্যাপটপের মাধ্যমে কয়েকটি ওয়ালেটে প্রবেশ করে। এরপর বাইন্যান্সের ওয়ালেট থেকে অর্থ নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ওয়ালেটে সরিয়ে নেয়।
সৌভাগ্যক্রমে, বাইন্যান্স ও এর অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো চুরি হওয়া অর্থের ২৭০ কোটি ডলার জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে বাকি অর্থ এখনো হামলাকারীদের ওয়ালেটে রয়েছে।
ঘটনার সময়ানুক্রম তুলে ধরা হলো।
বৃহস্পতিবার
মধ্য ইউরোপীয় সময় রাত ১০টা ২৯ মিনিট: সম্ভাব্য নিরাপত্তা সমস্যার বিষয়ে পাওয়া তথ্য তদন্ত করছে বলে জানায় বাইন্যান্স। গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের অর্থ ‘সম্পূর্ণ নিরাপদ’। একই সঙ্গে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সতর্ক করে।
রাত ১১টা ১৫ মিনিট: নিরাপত্তা যাচাই চলছে বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি। সমস্যা সমাধান হলেই অর্থ উত্তোলনসেবা আবার চালু করা হবে বলে জানানো হয়।
শুক্রবার
রাত ১২টা ৬ মিনিট: বাইন্যান্স আলফা ট্রেডিং সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান হলে লেনদেন আবার চালু হবে বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি। গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ থাকার কথাও পুনরায় জানানো হয়।
রাত ১২টা ২২ মিনিট: সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় বাইন্যান্স। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, অর্থ জব্দ হওয়ার খবর তাদের জানা আছে। এ পর্যন্ত ২৫৪ কোটি ডলার জব্দ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে সম্পদের অবস্থান শনাক্ত ও জব্দ করার চেষ্টা চলছে। ফলে জব্দ করা অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
বাইন্যান্স থেকে ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো চুরি, দায়ী ‘উত্তর কোরিয়ার’ হ্যাকাররা
৩০ অক্টোবর ২০২৬
রাত ১টা ১৩ মিনিট: এক বিবৃতিতে বাইন্যান্স জানায়, ‘সব ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে’। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সব ধরনের অর্থ জমা ও উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে বলেও জানায় প্রতিষ্ঠানটি।রাত ১টা ৫২ মিনিট: জব্দ করা সম্পদের পরিমাণ হালনাগাদ করে বাইন্যান্স জানায়, তা বেড়ে ৩০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
রাত ৩টা ২৫ মিনিট: বাইন্যান্স জানায়, এ ঘটনায় মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের একজন ডেভঅপস প্রকৌশলীর হ্যাক হওয়া ল্যাপটপের মাধ্যমে হামলাকারীরা প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিল। এর ফলে তারা একটি সার্ভিস কনটেইনারে প্রবেশ করতে এবং অনুমোদনহীন অর্থ উত্তোলনের নির্দেশ পাঠাতে সক্ষম হয়।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, কোনো ওয়ালেটের প্রাইভেট কি ফাঁস হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকানার অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি অর্থের সন্ধান ও উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ব্লকচেইন অংশীদারদের সঙ্গে কাজ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোও জব্দ করা হয়েছে।
ভোর ৫টা ৩৬ মিনিট: এক হালনাগাদ তথ্যে বাইন্যান্স জানায়, এ ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। শুধু ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার ঘটনাই এর জন্য দায়ী নয়।
সকাল ৯টা ৪৭ মিনিট: হ্যাক হওয়া ল্যাপটপের মাধ্যমে হামলাকারীরা প্রবেশের সুযোগ পেয়ে থাকতে পারে—আগের বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করে বাইন্যান্স। তবে তদন্তকারীরা ‘জটিল এই হামলায়’ আরও কয়েকটি নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করেছেন বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি। আগামী ৪৫ ঘণ্টার মধ্যে অর্থ উত্তোলনসেবা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানানো হয়।
সকাল ১১টা ৫৫ মিনিট: ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের সম্পদ পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানায় বাইন্যান্স। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এ ঘটনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ৬৩৪ কোটি ডলার সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রতিষ্ঠানটি লিখেছে, ‘আমরা এই সংকট কাটিয়ে উঠব।’
যেভাবে হামলা চালানো হয়
বাইন্যান্স জানিয়েছে, একাধিক কারণের সমন্বয়ে ‘জটিল এই হামলার’ ঘটনা ঘটেছে।
প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের একজন ডেভঅপস প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার সঙ্গে এ ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে। এর মাধ্যমে হামলাকারীরা একটি সার্ভিস কনটেইনারে প্রবেশ করে অনুমোদনহীন অর্থ উত্তোলনের নির্দেশ পাঠাতে সক্ষম হয়।
ব্লকচেইন তথ্য অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান বিটকোয়ারি জানিয়েছে, বাইন্যান্সের নিজস্ব অর্থ উত্তোলনব্যবস্থা তাদের ১৭টি হট ওয়ালেট থেকে ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি সরিয়ে নেওয়ার অনুমোদন দেয়। বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ৪ মিনিট থেকে শুক্রবার রাত ১২টা ৫৬ মিনিটের মধ্যে চার ঘণ্টারও কম সময়ে এ ঘটনা ঘটে।
বিটকোয়ারির তথ্য অনুযায়ী, অর্থ চুরি ঠেকাতে স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী টেথার, সার্কেল ও আরবিট্রামসহ আরও চারটি ছোট প্রতিষ্ঠান ২৭০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করে। অন্যদিকে, বিটকয়েনের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, মোট ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
তবে সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়া শুরুর আগেই হামলাকারীরা আরও ৭২ কোটি ৯০ লাখ ডলারের স্টেবলকয়েন অন্য মুদ্রায় রূপান্তর করে। বিটকোয়ারির তথ্য অনুযায়ী, সবশেষে হামলাকারীদের হাতে প্রায় ৩১০ কোটি ডলারের সম্পদ থেকে যায়। এর বেশির ভাগই ইথার ও বিটকয়েন।
বিটকোয়ারি আরও জানিয়েছে, চুরি হওয়া অর্থ ৯টি ব্লকচেইনজুড়ে নতুন নতুন ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইথেরিয়াম, বিটকয়েন ও ট্রন নেটওয়ার্ক।
অর্থের সন্ধান ও উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ব্লকচেইন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে বাইন্যান্স।
নিরাপত্তা যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে অর্থ জমা ও উত্তোলন বন্ধ রেখেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকানার অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে। অর্থের সন্ধান ও উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ব্লকচেইন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
তদন্ত শেষ এবং সব তথ্য যাচাইয়ের পর বিস্তারিত প্রযুক্তিগত প্রতিবেদন প্রকাশ করার কথা জানিয়েছে বাইন্যান্স। নিরাপত্তা পুনরুদ্ধারের কাজ শেষ হলে হালনাগাদ ‘প্রুফ অব রিজার্ভস’ প্রতিবেদনও প্রকাশ করবে প্রতিষ্ঠানটি। এতে গ্রাহকদের আমানতের বিপরীতে পর্যাপ্ত সম্পদ সংরক্ষিত থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হবে।হামলার পেছনে কারা?
ব্লকচেইন গোয়েন্দা ও সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস দাবি করেছে, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গোষ্ঠী ‘ট্রেডারট্রেইটর’ এ হামলার পেছনে রয়েছে।
এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ‘ব্লকচেইনের ভেতরের ও বাইরের শক্তিশালী গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা উচ্চমাত্রার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি।’
টিআরএম আরও জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাইবিট থেকে ১৫০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির জন্যও একই হ্যাকার গোষ্ঠীকে দায়ী করেছিল এফবিআই।
সূত্র: ইউরো নিউজ






