দাবানলে বিপন্ন গোলাপি কাকাতুয়া

শেষ আবাস হারিয়ে সংকটে রাজকীয় পাখিটি
অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ওয়াইপারফেল্ড ন্যাশনাল পার্কের প্রবেশদ্বারে আজকাল প্রায়ই দেখা মেলে এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যের। এক ডজনেরও বেশি গোলাপি কাকাতুয়া পাখি পাইন গাছের সারিতে ঠিক ক্রিসমাসের রঙিন সাজসজ্জার মতো ঝুলে থাকে। এগুলো অবশ্য আলেপ্পো পাইন গাছ, যা পাখিদের আসল ঘরবাড়ি ও খাবারের মূল উৎস মোটেও নয়।
তা সত্ত্বেও, এই ডানাওয়ালা রঙিন পাখিরা ডালপালার মাঝে বেশ শান্তিতেই দিন কাটায়। তাদের ধারালো নখ ও ঠোঁট দিয়ে পাইন ফলগুলো টুকরো টুকরো করার এক মৃদু মচমচে শব্দে বনের শান্ত বাতাসকে সারাক্ষণ মুখরিত করে রাখে। কিন্তু এই চমৎকার ও শান্ত দৃশ্যটি আসলে ভেতরের এক মস্ত বড় ধ্বংসযজ্ঞের নির্মম সত্যকে আড়াল করে রাখে। পার্কের ভেতরে এই কাকাতুয়াদের মূল বাসস্থানের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা, যা ‘পাইন প্লেইনস’ নামে পরিচিত, গত জানুয়ারির এক বিধ্বংসী বুনো আগুনে পুরোপুরি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সেখানে এখন স্রেফ পড়ে আছে কয়লা, ছাই আর খাঁ খাঁ শূন্যতা।
প্রকৃতির এই চরম বিপর্যয় বিপন্ন প্রজাতির পাখি ‘লোফোক্রোয়া লিডবিটেরি’-র জন্য এক মস্ত বড় দুঃসংবাদ বয়ে এনেছে, যাকে সাধারণ মানুষ আগে ‘মেজর মিচেলস ককাটু’ নামে ডাকত। পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. ভিক্টর হার্লি এই পাখিদের ভালোবেসে ‘ফ্লেম-ক্রেসটেড’ বা সংক্ষেপে ‘ফ্লেমিং ককাটু’ বলে ডাকেন। এদের মাথার ওপর আছে এক জ্বলন্ত লাল ও হলুদ রঙের চমৎকার ঝুঁটি এবং ডানার নিচে ছড়িয়ে আছে স্যামন মাছের মতো মনকাড়া গোলাপি আভা।
কয়েক দশক ধরে এই পাখিদের ওপর নজর রাখা ড. হার্লি জানান, এই বিশেষ প্রজাতির পাখিরা নিজেদের ডিম পাড়ার বাসা বা খোঁড়ল তৈরির জন্য ‘ক্যালিপট্রিস গ্র্যাসিলিস’ নামের এক বিশেষ ধরণের চিকন সাইপ্রাস পাইন গাছের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে। তবে একটি ক্রমবর্ধমান কাকাতুয়া পরিবারকে জায়গা দিতে এই গাছগুলোকে হতে হয় অনেক প্রাচীন— এই প্রায় ৮৫ বছর এবং আদর্শভাবে ১২৫ বছর কিংবা তার চেয়েও বেশি পুরনো।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ২০১৪ সালের এক মস্ত বড় আগুনের কারণে এই বিশাল ও পুরনো পাইন গাছগুলো আগে থেকেই প্রকৃতিতে বড্ড দুর্লভ হয়ে উঠেছিল। সে সময়কার আগুনে পাইন প্লেইনসের ৬০ শতাংশ এলাকা পুরোপুরি পুড়ে যায়। ওই অঞ্চলের খোঁড়ল বা গর্ত থাকা প্রায় ৯৭ শতাংশ প্রাচীন গাছই সেবার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
আর এটি ছিল সাম্প্রতিক ২০২৫-২৬ সালের ভয়াবহ বুনো আগুনের আগের ঘটনা, যা সরকারি হিসাব মতে ভিক্টোরিয়া জুড়ে প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমি পুড়িয়ে খাক করে দিয়েছে। এই আয়তনটি মূলত ইতিহাসের কুখ্যাত ‘ব্ল্যাক স্যাটারডে’র অগ্নিকাণ্ডের চেয়েও আকারে অনেক বড়। এর মধ্যে প্রায় ৫৯ হাজার হেক্টর জমি ছিল কেবল এই ওয়াইপারফেল্ড পার্কের ভেতরে।
ড. হার্লি আক্ষেপ করে বলেছেন, ভিক্টোরিয়ার সবচেয়ে বড় প্রজনন কেন্দ্র ওয়াইপারফেল্ডে মাত্র ১২ বছরের ব্যবধানে দুটি বড় আগুন এই কাকাতুয়াদের মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে। আগে এই পুড়ে যাওয়া এলাকায় ১৭৮টি বিশাল ও প্রাচীন পাইন গাছ দাঁড়িয়ে ছিল, যার মধ্যে এখন মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি গাছ কোনোমতে বেঁচে আছে।
পার্কের পূর্ব প্রান্তের অক্ষত বনটি দেখলে বোঝা যায় পাখিরা কত চমৎকার ঘর হারিয়েছে। এখানকার আধা-শুষ্ক বনাঞ্চলে শত শত শক্ত ক্যাসুরিনা ও চিকন সাইপ্রাস পাইন গাছ ছড়িয়ে আছে, আর বালুময় মাটিতে জন্মেছে লাইকেন ও শ্যাওলা।
এই বনেই একটি কাঠের খুঁটির মাথায় ক্রুশের মতো করে পাখির থাকার উপযোগী ফাঁপা গাছের গুঁড়ি ও ছোট দরজা বানানো আছে। এটি মূলত ২০০৯ সালে ড. হার্লির নিজের হাতে তৈরি প্রথম কৃত্রিম খোঁড়ল।সাধারণত গাছ যথেষ্ট বড় হলে কাকাতুয়ারা নিজেরাই ঠোঁট দিয়ে খুঁড়ে নিজেদের থাকার চমৎকার জায়গা বা খোঁড়ল তৈরি করে নেয়।
কিন্তু এক্ষেত্রেও আছে ঝামেলা, বনের প্রাকৃতিক খোঁড়ল বা বাসা দখল করার জন্য পাখিদের মধ্যে শুরু হয় তীব্র যুদ্ধ হয়। শান্ত স্বভাবের ‘ফ্লেমিং ককাটু’রা সহজে লড়াই করতে পারে না। তারা ‘গালাহ’ পাখির মতো হিংস্র পাখি কিংবা বুনো ইউরোপীয় মৌমাছিদের কাছে হেরে গিয়ে নিজেদের বাসা হারায়। ফলে সমস্যাটি এখন কেবল বাসার অভাব নয়, বরং বাসা ধরে রাখার ক্ষমতার অভাব।
ড. হার্লি ও তার স্বেচ্ছাসেবী দল ‘ম্যালি উডপেকার্স’ এই পাখিদের স্বভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। বনের কৃত্রিম ঘরের অভাব মেটাতে তারা নিজেদের উদ্যোগে নতুন নতুন বাসা বানাচ্ছেন।
আজকাল তারা বনের পুড়ে যাওয়া কিন্তু সোজা দাঁড়িয়ে থাকা মরা গাছের গুঁড়ির ভেতর আধুনিক ডিজাইনের নতুন বাসা তৈরি করছেন।
তারা চেইনসো বা করাত দিয়ে গাছের একটি অংশ প্রথমে কেটে ফেলেন। তারপর ভেতরের অংশে অন্তত ২০ সেন্টিমিটার চওড়া একটি ফাঁপা জায়গা তৈরি করেন। সবশেষে গাছের বাইরের ছালটি আবার আগের জায়গায় আটকে দেন যাতে বৃষ্টির পানি ভেতরে ঢুকতে না পারে। তৈরি হওয়া এই কৃত্রিম বাসাগুলো সাধারণ মানুষের চোখে সহজে ধরা পড়ে না। এটি স্রেফ একটি আরামদায়ক ঘরের মুখে ছোট একটি দরজার মতো দেখায়, যেখানে পাখিদের বসার জন্য একটি ছোট্ট ডালও জুড়ে দেওয়া হয়।
পার্কস ভিক্টোরিয়ার সাথে যৌথ উদ্যোগে তারা এ পর্যন্ত বনের ভেতর প্রায় ১৫০টি এমন নতুন কৃত্রিম খোঁড়ল স্থাপন করেছেন।
স্থনীয় আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্বকারী ‘বারেনজি গ্যাডজিন ল্যান্ড কাউন্সিল’ এই পাখিদের বাসস্থান ধ্বংস হওয়াকে এক মস্ত বড় উদ্বেগের কারণ বলে মনে করে। কাউন্সিলের ম্যানেজার কলিন গর্ডন বলেছেন, ‘এই গোলাপি কাকাতুয়া আমাদের লোকগাথা ও গল্পের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বাস করে। এটি আমাদের সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রজাতি।’
কাউন্সিল বনের এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী সব ধরণের চেষ্টাকে সমর্থন করলেও গর্ডন মনে করিয়ে দেন, আগুনে হারিয়ে যাওয়া গাছগুলো আবার বড় হয়ে এই কাকাতুয়াদের থাকার উপযোগী হতে আরও বহু বছর সময় লেগে যাবে।
বনের অল্প কিছু বেঁচে থাকা পুরনো গাছ বাদ দিলে, পাইন গাছের পরবর্তী নতুন দলটি মূলত ১৯৯০-এর দশকে অংকুরিত হয়েছিল। এগুলো পাখিদের বাসা তৈরির উপযোগী হতে এখনও প্রায় অর্ধেক শতাব্দী বা ৫০ বছর সময় নেবে। তবে এই কচি পাইন গাছগুলো পাখিদের খাবারের এক মস্ত বড় চাহিদা পূরণ করছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানী জেন হোয়াইটের মতে, কাকাতুয়ারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার সময় মুখে করে বীজসহ সাইপ্রাস গাছের ডাল নিয়ে ঘোরে, যেন তারা 'প্যাকড লাঞ্চ' বা দুপুরের খাবার সাথে নিয়ে চলেছে। এই পাখিরাই বনের পাইন গাছের বীজ ছড়িয়ে দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। আর গাছ বড় হলে কাকাতুয়ারা নিজেরা ঠোঁট দিয়ে খোঁড়ল তৈরি করে, যার ভেতর পরবর্তীতে বিভিন্ন ধরণের টিকটিকি, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং অন্যান্য ছোট পাখিরা নিজেদের আশ্রয় খুঁজে পায়।






