শুধু জাতি নয়, ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেয়েছিল ‘মার্কিন ভাষা’ও

ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেয়েছিল ‘মার্কিন ভাষা’ও
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা কি শুধু নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল, নাকি জন্ম দিয়েছিল নতুন এক ভাষার পরিচয়েরও? স্বাধীনতার চার দশকও পূর্ণ হয়নি, এমন সময় ১৮১৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন লিখেছিলেন- নতুন ভূখণ্ড, নতুন জলবায়ু, নতুন শিল্প ও নতুন অভিজ্ঞতা মানুষের সামনে নতুন ধারণা নিয়ে আসে; সেগুলো প্রকাশ করতে দরকার নতুন শব্দ, নতুন বাক্যবন্ধ। তার বিশ্বাস ছিল, একদিন আমেরিকান ইংরেজি শুধু শক্তিতেই নয়, নামেও ব্রিটিশ ইংরেজি থেকে আলাদা হয়ে উঠতে পারে।
এই ভাবনার শিকড় অবশ্য আরও গভীরে। স্বাধীনতার আগেই ব্রিটিশ লেখকরা অভিযোগ তুলছিলেন, আমেরিকানরা ইংরেজি ভাষার বিশুদ্ধতা নষ্ট করছে। কিন্তু নবীন রাষ্ট্রের কাছে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, জাতীয় পরিচয় গঠনের হাতিয়ারও।
তবে আমেরিকান ইংরেজির এই উত্থান সবাই ভালো চোখে দেখেননি। ১৭৫৬ সালে ব্রিটিশ অভিধানকার স্যামুয়েল জনসন আমেরিকান ইংরেজিকে ভাষার ‘দূষণ’-এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর আমেরিকার অনেক চিন্তাবিদ ভাষার এই পরিবর্তনকে জাতীয় পরিচয়ের স্বাভাবিক প্রকাশ বলে মনে করেন। ভাষা নিয়ে এই টানাপড়েনই দেখায়, আমেরিকান ইংরেজির জন্মশুধু ভাষার বিবর্তনের গল্প নয়, বরং একটি নতুন জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণের ইতিহাসও।
ভাষায় স্বাধীনতার ছাপ
উনিশ শতকের শুরুতে এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন অভিধানপ্রণেতা নোয়া ওয়েবস্টার। তার মতে, স্বাধীন রাষ্ট্রের যেমন নিজস্ব সরকার দরকার, তেমনি দরকার নিজস্ব ভাষাব্যবস্থা। সেই লক্ষ্যেই তিনি ব্যাকরণ, বানানবিধি ও অভিধান রচনা করেন।
আজ আমেরিকান ইংরেজির বহু পরিচিত বানানের পেছনে তার প্রভাব স্পষ্ট। ‘হনর’ বা ‘ফেভর’-এর মতো শব্দ থেকে ‘ইউ’ বাদ দেওয়া, ‘ট্রাভেল্ড’-এ একটিমাত্র ‘এল’ ব্যবহার, ‘ড্রাফট’ বা ‘সেন্টার’-এর মতো রূপ প্রতিষ্ঠা - সবই সেই প্রচেষ্টার ফল। যদিও তার সব প্রস্তাব সফল হয়নি। ‘লেদার’-কে ‘লেথার’ লেখার মতো কিছু সংস্কার দ্রুতই হারিয়ে যায়। তবু তার বানান বই পরবর্তী এক শতকে প্রায় ১০ কোটি কপি বিক্রি হয়েছিল।
নতুন পৃথিবী, নতুন শব্দ
আমেরিকার ইংরেজি শুধু বানানে নয়, শব্দভাণ্রেও নতুন রূপ পায়। স্থানীয় আদিবাসী ভাষা থেকে আসে ‘স্কাঙ্ক’ র্যাকুন’, ‘চিপমাঙ্ক’, ‘মুস’, ‘ওপোসাম’ ও ‘ক্যারিবু’র মতো শব্দ। আবার ফরাসি ও ডাচ উপনিবেশবাদীদের ভাষা থেকে আসে ‘প্রেইরি’ ও ‘কুকি’।
অন্যদিকে কিছু শব্দ আমেরিকায় জন্ম নিয়ে পরে ব্রিটেনেও ছড়িয়ে পড়ে। যেমন ‘ডেডলাইন’ শব্দটির উৎপত্তি মার্কিন গৃহযুদ্ধের সময়; প্রথমে এর অর্থ ছিল এমন একটি সীমারেখা, যা অতিক্রম করলে গুলি খাওয়ার ঝুঁকি থাকত।
আবার যা আমেরিকান বলে মনে হয়, সবই নতুন নয়।
মজার বিষয় হলো, অনেক তথাকথিত ‘আমেরিকান’ শব্দ আসলে পুরনো ব্রিটিশ ব্যবহার। ‘অটাম’-এর বদলে ‘ফল’ বলাকে আজ আমেরিকান বৈশিষ্ট্য মনে হলেও, ষোড়শ শতক থেকেই ব্রিটেনে এ শব্দের ব্যবহার ছিল। পরে ব্রিটেনে তা হারিয়ে গেলেও আমেরিকায় টিকে যায়।
একইভাবে ‘সকার’, ‘ম্যাড’, ‘স্মার্ট’, ‘সিক’ কিংবা ‘গটেন’-এর মতো বহু শব্দ ও ব্যাকরণিক রূপ আমেরিকায় নতুন জীবন পায়। কখনো শব্দের অর্থ বদলায়, কখনো বদলে যায় তার সামাজিক মর্যাদা। যে শব্দ ব্রিটেনে স্বাভাবিক, তা আমেরিকায় গ্রাম্য বা সেকেলে বলে বিবেচিত হতে পারে।
ভাষার ভেতরে জাতীয় পরিচয়
জার্মান গবেষক ইনগ্রিড পলসেন উনিশ শতকের প্রায় আট কোটি সংবাদপত্রের নিবন্ধ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, ভাষাগত পরিবর্তন কীভাবে জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। সে সময় ‘ট্রাউজার্স’ না ‘প্যান্টস’- এই বিতর্কও ছিল সাংস্কৃতিক অবস্থানের প্রতীক। এমনকি ব্যঙ্গচিত্রে ‘ডিউড’ চরিত্রকে এমন একজন হিসেবে দেখানো হতো, যে আমেরিকান হয়েও ব্রিটিশ সাজতে চায়।
তবে বিচ্ছিন্নতার এই গল্পের পাশাপাশি রয়েছে সংযোগের ইতিহাসও। শিক্ষা, বাণিজ্য, বইপত্র ও পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যম - সবকিছুই দুই দেশের ভাষাকে পরস্পরের সংস্পর্শে রেখেছে। ভাষাবিদ লিন মারফির মতে, এই যোগাযোগ না থাকলে হয়তো আজ ব্রিটিশ ও আমেরিকান ইংরেজি আলাদা ভাষায় পরিণত হতো।
পরিবর্তনের শেষ নেই
ভাষার বিবর্তন কখনো থেমে থাকে না। অভিধান, ব্যাকরণ কিংবা বানানের নিয়ম ভাষাকে একটি কাঠামো দিলেও, মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারই শেষ পর্যন্ত তার গতিপথ নির্ধারণ করে। ডিজিটাল যুগে সেই পরিবর্তনের গতি আরও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন কথোপকথন এবং তাৎক্ষণিক যোগাযোগের বিস্তার ভাষার নতুন রূপগুলোকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
২০১৮ সালে ভাষাবিদ জ্যাক গ্রিভ টুইটারের বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখান, আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল এখনো নতুন শব্দ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এসব শব্দের অনেকগুলোই প্রথমে নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা অঞ্চলের মধ্যে ব্যবহৃত হলেও, প্রযুক্তির কল্যাণে দ্রুত বৃহত্তর জনপরিসরে পৌঁছে যাচ্ছে।
গ্রিভের গবেষণা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে। যেসব অঞ্চলে ভাষাগত উদ্ভাবন সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, সেখানেই আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর উপস্থিতিও তুলনামূলকভাবে বেশি। তার ধারণা, সামাজিক পরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা এই ভাষাগত সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করে। নতুন শব্দের পাশাপাশি ব্যাকরণেও তার প্রভাব পড়ছে।
এই নতুন ও সৃজনশীল কথ্য রীতিগুলো শেষ পর্যন্ত আমেরিকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে কি না, কিংবা ব্রিটেনের উপকূলেও পৌঁছবে কি না, তা এখনো দেখার বিষয়। তবে প্রযুক্তি ভাষাগত পরিবর্তনের বীজ ছড়িয়ে পড়ার জন্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সুযোগ করে দিয়েছে। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পরে জেফারসনের ভবিষ্যদ্বাণী পুরোপুরি সত্য হয়নি। আমেরিকান ইংরেজি ব্রিটিশ ইংরেজি থেকে আলাদা ভাষায় পরিণত হয়নি। আমেরিকান ও ব্রিটিশ ইংরেজি আজও একই ভাষার দুই রূপ। কিন্তু নতুন শব্দ, নতুন ব্যবহার এবং নতুন সাংস্কৃতিক প্রভাব সেই যৌথ ভাষাকে ক্রমাগত সমৃদ্ধ করে চলেছে।
আটলান্টিকের দুই পাড় আজও একই ভাষা ভাগ করে নিলেও, সেই ভাষার বৈচিত্র্যই তাদের আলাদা ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের নিজস্ব সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
বিবিসি থেকে ভাষান্তর : রুবাইয়া জেসমিন




