নজিরবিহীন ছবিতে মিলল নতুন সূত্র
সূর্যের রহস্য উন্মোচনের পথে বিজ্ঞান

সংগৃহীত ছবি
মহাবিশ্বের প্রাণকেন্দ্র সূর্যকে ঘিরে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের এক জটিল রহস্যের সমাধান মিলতে পারে এবার। বুধবার প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এমন কিছু অভূতপূর্ব উচ্চ-রেজোলিউশনের ছবি প্রকাশ করেছেন, যেখানে সূর্যের পৃষ্ঠে এত সূক্ষ্ম গঠন প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।
গবেষকদের বিশ্বাস, এই নতুন পর্যবেক্ষণই ব্যাখ্যা করতে পারে কেন সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল বা করোনা তার দৃশ্যমান পৃষ্ঠের তুলনায় কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রি বেশি উত্তপ্ত। এই যুগান্তরকারী পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই অঙ্গরাজ্যের মাউই দ্বীপে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর দূরবীক্ষণ যন্ত্র ‘ইনোউয়ে সোলার টেলিস্কোপ’-এর মাধ্যমে। সূর্যের একটি চৌম্বকীয়ভাবে সক্রিয় অঞ্চলে, সূর্যকলঙ্কের কাছাকাছি মাত্র ২০ কিলোমিটারেরও কম আকারের গঠন শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
এত ক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্য এর আগে কোনো সৌর পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েনি। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সোলার অবজারভেটরির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. ফ্রিডরিখ ভ্যোগার বলেছেন, এগুলো সূর্যের পৃষ্ঠের ইতিহাসে তোলা সবচেয়ে স্পষ্ট ছবি। এর আগে একই দূরবীক্ষণ যন্ত্রে সূর্যের পৃষ্ঠে ফ্রান্সের সমান আকারের দানাদার গঠন দেখা গিয়েছিল।
এবার পর্যবেক্ষণের সূক্ষ্মতা আরও অনেক বেড়েছে। গবেষক দলের সদস্য ড. ডেভিড কুরিদজে জানিয়েছেন, প্রথমবার ছবিগুলো দেখে তিনি অবাক হয়েছিলেন। সূর্যের পৃষ্ঠে এত সূক্ষ্ম ও ছোট গঠন দেখা যায়, তা আগে কেউ ভাবেনি। নতুন ছবিতে বিজ্ঞানীরা ঘূর্ণাবর্তের মতো ক্ষুদ্র কাঠামো শনাক্ত করেছেন, যাকে ‘কেলভিন-হেল্মহোল্টজ অস্থিতিশীলতা’ বলা হয়।
দ্রুতগতির উত্তপ্ত প্লাজমা ধীরগতির প্লাজমার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হলে তাদের সংযোগস্থলে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, সেখান থেকেই এই ঘূর্ণাবর্তের জন্ম। পৃথিবীর সমুদ্র, হ্রদ কিংবা মেঘমালায় এমন ঘটনা আগে দেখা গেলেও সূর্যে এর উপস্থিতির প্রত্যক্ষ প্রমাণ এবারই প্রথম মিলল। গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই ঘূর্ণাবর্ত সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রকে পাকিয়ে দেয়। পরে সেই পাকানো চৌম্বক রেখা ছিঁড়ে বিপুল শক্তি তাপ হিসেবে নির্গত হয়। এই প্রক্রিয়াই সম্ভবত সূর্যের করোনাকে কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত করে, যদিও সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৬ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বিজ্ঞানীদের মতে, সূর্যে ঘটে যাওয়া সৌর জ্বালা, প্লাজমার বিস্ফোরণ এবং করোনাল ভর নির্গমনের মতো ঘটনাগুলোর পেছনেও এই জটিল চৌম্বকীয় প্রক্রিয়া কাজ করে। এসব বিস্ফোরণের প্রভাব পৃথিবীতেও পড়তে পারে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা, উপগ্রহ, জিপিএস, যোগাযোগ নেটওয়ার্কসহ নানা প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এতে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ড. কুরিদজের কথায়, এই আবিষ্কার সৌর পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার গত পঞ্চাশ বছরের অন্যতম বড় রহস্যের সমাধানের পথ খুলে দিতে পারে। তার ভাষ্য, এই অস্থিতিশীলতার ফলে শক্তি ধাপে ধাপে ক্ষুদ্র স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা তাপে রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়াই সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডলকে অস্বাভাবিকভাবে গরম করে তুলতে পারে।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, নতুন এই পর্যবেক্ষণ শুধু সূর্যের আচরণ বোঝার ক্ষেত্রেই নয়, ভবিষ্যতে মহাকাশের আবহাওয়া সম্পর্কে আরও নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়ার পথও সুগম করবে।
ভাষান্তর : রুবাইয়া জেসমিন






