২৭ বছর পর ইউরোপে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ

২৭ বছর পর ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে দেখা যাবে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ।
ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে ২৭ বছর পর দেখা যাবে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। স্থানীয় সময় বুধবার (১২ আগস্ট) চাঁদ সূর্যের সামনে এসে তাকে পুরোপুরি ঢেকে দেবে। এতে দিনের আলোয় কিছু সময়ের জন্য নেমে আসবে অন্ধকার। পূর্ণগ্রাস দেখতে স্পেন, আইসল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে জড়ো হয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। ব্রিটেন পূর্ণগ্রাসের সরু পথের বাইরে থাকলেও সেখানে সূর্যের প্রায় ৯০ থেকে ৯৬ শতাংশ চলে যাবে চাঁদের আড়ালে।
নাসার হিসাবে, চাঁদের পূর্ণ ছায়া উত্তর রাশিয়ার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও উত্তর আটলান্টিক পেরিয়ে পৌঁছাবে স্পেনে। উত্তর-পূর্ব পর্তুগালের ছোট একটি অংশও পূর্ণগ্রাসের পথে পড়বে। সবচেয়ে অনুকূল স্থানে সূর্য পুরোপুরি ঢাকা থাকবে দুই মিনিটের কিছু বেশি সময়। উত্তর আটলান্টিকে সর্বোচ্চ পূর্ণগ্রাস প্রায় দুই মিনিট ১৮ সেকেন্ড স্থায়ী হতে পারে।
পূর্ণগ্রাস দেখতে সবচেয়ে বেশি মানুষের সমাগমের সম্ভাবনা স্পেনে। পূর্ণগ্রাসের পথে থাকা উত্তর ও মধ্য স্পেন এবং বালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জে ৬০ লাখ পর্যন্ত দর্শনার্থী জড়ো হতে পারেন। মূল আইবেরীয় উপদ্বীপে ১৯১২ সালের পর এটিই প্রথম পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে ৬৬০টির বেশি সরকারি পর্যবেক্ষণস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবেন ৩৫ হাজারের বেশি কর্মকর্তা।
তবে গ্রহণ দেখতে গিয়ে ঝুঁকিও রয়েছে। স্পেনের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে রয়েছে দাবানলের আশঙ্কাও। তাই বনাঞ্চলে গাড়ি রাখা, আগুন জ্বালিয়ে খাবার রান্না করা কিংবা আগুনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি হতে পারে এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে দর্শনার্থীদের সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ।
আইসল্যান্ডেও সূর্যগ্রহণ ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। প্রায় চার লাখ মানুষের দেশটিতে ৮০ হাজার পর্যন্ত দর্শনার্থী আসতে পারেন। রাজধানী রেইকিয়াভিকের অনেক দোকানে এরই মধ্যে গ্রহণ দেখার বিশেষ চশমা শেষ হয়ে গেছে। পশ্চিম আইসল্যান্ডে পূর্ণগ্রাস দুই মিনিটের বেশি স্থায়ী হতে পারে।
আইসল্যান্ডে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৪৩ মিনিটের পর পূর্ণগ্রাস শুরু হবে। বাংলাদেশের সময়ে রাত ১১টা ৪৩ মিনিটের পর। স্পেনে পূর্ণগ্রাস শুরু হবে স্থানীয় সময় রাত ৮টা ২৬ মিনিটের দিকে। বাংলাদেশে তখন ১৩ আগস্ট রাত ১২টা ২৬ মিনিট। স্থানভেদে সময় কয়েক মিনিট এদিক-ওদিক হতে পারে। স্পেনে সূর্যাস্তের ঠিক আগমুহূর্তে দেখা যাবে পূর্ণগ্রাস।
ব্রিটেন পূর্ণগ্রাসের সরু পথের বাইরে থাকলেও প্রায় তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে গভীর আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখতে পাবে। রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির হিসাবে, স্থানভেদে সূর্যের ৯০ থেকে ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত চলে যাবে চাঁদের আড়ালে। কর্নওয়াল, ডেভন ও আইলস অব সিলির দিকে সূর্যের সবচেয়ে বেশি অংশ ঢাকা পড়বে। লন্ডনে ঢাকা পড়বে সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রায় ৯১ শতাংশ সূর্য।
স্কটল্যান্ডে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার কিছু পর গ্রহণ শুরু হবে। লন্ডন, ব্রিস্টল ও কার্ডিফে শুরু হবে প্রায় সন্ধ্যা ৬টা ১৭ মিনিটে। ব্রিটেনজুড়ে সর্বোচ্চ গ্রহণ দেখা যাবে সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিট থেকে ৭টা ১৬ মিনিটের মধ্যে। বাংলাদেশে তখন মধ্যরাত পেরিয়ে যাবে। স্থানীয় সময় রাত ৮টা ১০ মিনিটের আগেই ব্রিটেনে শেষ হবে গ্রহণ।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসও মোটামুটি অনুকূল। মধ্য ও দক্ষিণ ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের বড় অংশে আকাশ পরিষ্কার থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উত্তর ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং বিশেষ করে উত্তর আয়ারল্যান্ডে মেঘ গ্রহণ দেখায় বাধা দিতে পারে।
এই গ্রহণের প্রভাব পড়তে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। ইউরোপজুড়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সাময়িকভাবে উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে। ব্রিটেনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্রহণের সময়ের জন্য তারা অনেক আগেই প্রস্তুতি নিয়েছে।
বিজ্ঞানীদের কাছেও এবারের সূর্যগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। নাসা আইসল্যান্ড থেকে উচ্চ-উড্ডয়ন গবেষণা বিমান পরিচালনা করে চাঁদের ছায়া অনুসরণ করবে। একই সঙ্গে সূর্যের করোনা এবং আকস্মিক অন্ধকারের কারণে পৃথিবীর নিম্ন বায়ুমণ্ডলে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকানো যাবে না। ব্রিটেনের মতো যেসব স্থানে গ্রহণটি আংশিক দেখা যাবে, সেখানেও কোনো সময় খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকানো নিরাপদ নয়। সাধারণ রোদচশমাও এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য বিশেষ গ্রহণচশমা বা নিরাপদ পরোক্ষ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।
বাংলাদেশের আকাশে অবশ্য এই সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না। দেশটি গ্রহণের দৃশ্যমান এলাকার বাইরে রয়েছে।
ইউরোপের জন্য এবারের দিনটি তাই বিরল। ব্রিটেনে পরবর্তী পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে ২০৯০ সালে। ফলে বুধবার সেখানে পূর্ণ অন্ধকার না নামলেও সূর্যের প্রায় পুরোটা যখন চাঁদের আড়ালে মিলিয়ে যাবে, সেই বিরল দৃশ্যটি বহু মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন থেকে যাবে।






