হরমুজ বন্ধ থাকলে ব্রিটেনের প্রবৃদ্ধি নামতে পারে ০.৩ শতাংশে

ইরান যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এবং হরমুজ প্রণালি চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত কার্যত বন্ধ থাকলে আগামী বছর প্রায় থমকে যেতে পারে ব্রিটেনের অর্থনীতি। এমনই উদ্বেগজনক হিসাব দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ও অর্থমন্ত্রী জন হিলিকে। বুধবার এই অভ্যন্তরীণ পূর্বাভাসের খবর প্রথম প্রকাশ্যে আসে। দেশটির ট্রেজারি সূত্র নিশ্চিত করেছে, সবচেয়ে খারাপ কিন্তু বাস্তবসম্ভব পরিস্থিতি ধরে করা ওই মডেলিংয়ে ২০২৭ সালে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মাত্র ০.৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে বার্নহ্যাম ও হিলিকে ঠিক কোন দিন এই ব্রিফিং দেওয়া হয়েছিল, তা প্রকাশ করা হয়নি।
হিসাবটি সরকারের নতুন আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস নয়। বরং সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় ট্রেজারির তৈরি ‘যুক্তিসংগত সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’। এতে ধরে নেওয়া হয়েছে, হরমুজ প্রণালি আরও প্রায় পাঁচ মাস কার্যত বন্ধ থাকবে এবং আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তিচুক্তি নতুন বছরের আগে হবে না।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু আগামী বছর নয়, চলতি বছরও ধাক্কা খাবে অর্থনীতি। ট্রেজারির হিসাবে ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ০.৯ শতাংশ। অথচ মার্চে ব্রিটেনের স্বাধীন বাজেট পর্যবেক্ষক সংস্থা ওবিআর চলতি বছরের জন্য ১.১ শতাংশ এবং ২০২৭ সাল থেকে গড়ে ১.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। অর্থাৎ হরমুজ-সংকট দীর্ঘ হলে আগামী বছরের প্রবৃদ্ধি সরকারি আগের পূর্বাভাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশে নেমে যেতে পারে।
আরও বড় উদ্বেগ মূল্যস্ফীতি নিয়ে। ট্রেজারির ওই মডেল অনুযায়ী, ২০২৭ সালের প্রথম তিন মাসে মূল্যস্ফীতি ৪.৩ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের মূল্যস্ফীতি ২.৬ শতাংশ, যা ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার কিছুটা ওপরে। জুনে বার্ষিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ২.৮ শতাংশ থেকে কমে ২.৬ শতাংশে এসেছিল।
এই আশঙ্কার কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহনপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাবে তেল ও জ্বালানির দাম বেড়েছে, একই সঙ্গে ব্যবসায়িক সরবরাহব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি হয়েছে। ব্রিটেন সরাসরি হরমুজের তেলের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব পরিবহন, উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের দামে এসে পড়ে।
বছরের শুরুটা অবশ্য ব্রিটিশ অর্থনীতির জন্য ভালো ছিল। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি ০.৬ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু এপ্রিলে অর্থনীতি ০.১ শতাংশ সংকুচিত হয়, মে মাসে আবার মাত্র ০.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়।
এখন নজর বৃহস্পতিবারের দিকে। ১৩ আগস্ট সকাল ৭টায় এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রান্তিকের জিডিপির প্রথম সরকারি হিসাব প্রকাশ করবে জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর ওএনএস। অর্থনীতিবিদেরা তিন মাসে প্রায় ০.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আশা করছেন। এই পরিসংখ্যানেই বোঝা যাবে, ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ব্রিটিশ অর্থনীতিতে ইতিমধ্যে কতটা প্রভাব ফেলেছে।
সরকারি কর্মকর্তারা অবশ্য বলেছেন, ট্রেজারি নিয়মিতভাবেই নানা সম্ভাব্য পরিস্থিতি ধরে অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করে। ফলে ০.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হিসাবকে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। হরমুজ দ্রুত খুলে গেলে কিংবা আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতা হলে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে যেতে পারে।
তার পরও নতুন সরকারের জন্য সতর্কবার্তাটি তাৎপর্যপূর্ণ। বার্নহ্যাম দায়িত্ব নিয়েছেন জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু হরমুজের জট যদি বছরের শেষ পর্যন্ত না খোলে, তবে তাঁর সরকারের সামনে একই সঙ্গে কম প্রবৃদ্ধি ও বেশি মূল্যস্ফীতির কঠিন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ ০.৩ শতাংশ এখনও নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়। কিন্তু ১২ আগস্ট প্রকাশ্যে আসা ট্রেজারির এই ঝুঁকি-হিসাব দেখাচ্ছে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তার মূল্য শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ব্রিটিশ অর্থনীতিকেও দিতে হতে পারে৷




