প্রতি মিনিটে একজন পাচ্ছেন ব্রিটেনে থাকার অধিকার
- রেকর্ডের মুখে স্থায়ী বসবাস

চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন, মাত্র তিন মাসে ১ লাখ ৪০ হাজার ১২২ জন অভিবাসী ‘ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন’ (আইএলআর) পেয়েছেন
ঘড়ির কাঁটা এক মিনিট ঘুরতে না ঘুরতেই ব্রিটেনে আরও একজন অভিবাসী পাচ্ছেন স্থায়ী বসবাসের অধিকার অথবা ব্রিটিশ নাগরিকত্ব। অবৈধ অভিবাসন ঠেকানো এবং বৈধ অভিবাসনের নিয়ম আরও কঠোর করা নিয়ে যখন ব্রিটিশ রাজনীতি উত্তপ্ত, ঠিক তখনই সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এল এই ছবি। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন, মাত্র তিন মাসে ১ লাখ ৪০ হাজার ১২২ জন অভিবাসী ‘ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন’ (আইএলআর) পেয়েছেন অথবা ব্রিটিশ নাগরিক হয়েছেন। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মিনিটে ১.০৭ জন। ২৭ আগস্ট ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন অভিবাসন পরিসংখ্যান প্রকাশের পর এই হিসাব সামনে এসেছে।
আইএলআর হল এমন একটি অভিবাসন মর্যাদা, যা কোনও ব্যক্তিকে সময়সীমা ছাড়াই ব্রিটেনে বসবাস, কাজ ও পড়াশোনার সুযোগ দেয়। যোগ্য হলে পরে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্বের আবেদনও করতে পারেন। তবে আইএলআর পাওয়া আর ব্রিটিশ নাগরিক হওয়া এক বিষয় নয়।
১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ
আরও তাৎপর্যপূর্ণ ছবি মিলেছে পুরো বছরের হিসাবে। ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ১ লাখ ৯৯ হাজার ৬২৮ জনকে সাধারণ সেটেলমেন্ট বা স্থায়ী বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আগের বছরের ১ লাখ ৬১ হাজার ৫৮৫ জনের তুলনায় তা ২৪ শতাংশ বেশি এবং ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চ।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮০ হাজার ৪০৯ জন কাজের ভিসা থেকে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেয়েছেন, যা এক বছরে ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। ভারতীয়রা সবচেয়ে বেশি আইএলআর পাওয়া জাতীয়তা, যা ৩৫ হাজার ৩৮৪ জন, আগের বছরের তুলনায় ৫১ শতাংশ বেশি। হংকংয়ের নাগরিকেরা ২২ হাজার ৫৯৩ জন এবং চীনা নাগরিকেরা ২১ হাজার ৩০০ জন।
ব্রিটিশ ন্যাশনাল (ওভারসিজ) বা বিএন(ও) ভিসাধারীদের স্থায়ী হওয়ার সংখ্যাও হঠাৎ বেড়েছে। ২০২১ সালে চালু হওয়া এই পথে প্রথম দিকে ব্রিটেনে আসা হংকংবাসীদের অনেকেই এখন প্রয়োজনীয় বসবাসের মেয়াদ পূর্ণ করেছেন। ফলে বিএন(ও) পথ থেকে সেটেলমেন্ট পাওয়া মানুষের সংখ্যা এক বছরে ৫৮৭ থেকে বেড়ে ৩৮ হাজার ৩৭৩ হয়েছে।
নাগরিকত্ব পেলেন প্রায় আড়াই লাখ
একই ১২ মাসে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৫২০ জন ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পেয়েছেন। আগের বছরের তুলনায় সংখ্যাটি ৪ শতাংশ কমলেও ঐতিহাসিক হিসাবে তা এখনও অনেক বেশি। এর মধ্যে ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৩৫ জন ‘ন্যাচারালাইজেশন’-এর মাধ্যমে নাগরিক হয়েছেন। নাগরিকত্ব পাওয়াদের মধ্যে ভারতীয় ২৪ হাজার ৮৫১ এবং পাকিস্তানি ১৮ হাজার ৪৮৯ জন, এই দুই জাতীয়তা শীর্ষে।
তবে ‘স্থায়ীভাবে থাকার অধিকার’ সংক্রান্ত আর একটি বড় সংখ্যা রয়েছে। ইইউ সেটেলমেন্ট স্কিমের অধীনে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ২২৯ জন সেটেল্ড স্ট্যাটাস পেয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই আগে প্রি-সেটেল্ড স্ট্যাটাস-এ ছিলেন। ফলে এঁদের সবাইকে নতুন করে ব্রিটেনে আসা অভিবাসী হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
নিয়ম আরও কঠোর করতে চান শাবানা
এই পরিসংখ্যান এমন সময়ে এল, যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ স্থায়ী বসবাসের নিয়ম আমূল বদলানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, অধিকাংশ অভিবাসীকে আইএলআর পাওয়ার আগে বর্তমান পাঁচ বছরের বদলে ১০ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। কম বেতনের বিদেশি কর্মী বা শরণার্থীদের ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় ১৫ কিংবা ২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
তবে লেবারেরই কয়েক জন পিছনের সারির এমপি এই পরিকল্পনা শিথিল করার দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে কেয়ার কর্মীদের ছাড় দেওয়া এবং ইতিমধ্যে ব্রিটেনে থাকা অভিবাসীদের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম প্রয়োগ না করার দাবি উঠেছে। সরকারের প্রস্তাবে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব না পাওয়া পর্যন্ত কিছু রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধের কথা রয়েছে।
হোটেল কমছে, বাড়ি-ফ্ল্যাটে প্রায় ৭০ হাজার আশ্রয়প্রার্থী
নতুন তথ্য বলছে, আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেলে রাখার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের জুনে যেখানে ৩২ হাজার ৪১ জন হোটেলে ছিলেন, ২০২৬ সালের জুন শেষে তা নেমে এসেছে ১৬ হাজার ২১ জনে, যা প্রায় অর্ধেক। ২০২৩ সালে সংখ্যাটি সর্বোচ্চ ৫৬ হাজার ১৮-তে পৌঁছেছিল।
কিন্তু একই সঙ্গে ৬৯ হাজার ৩৮ জন আশ্রয়প্রার্থী এখন বাড়ি, ফ্ল্যাট ও ভাগাভাগির আবাসনে সরকারি সহায়তায় রয়েছেন, যা এক বছরে ৪ শতাংশ বেশি এবং এক দশক আগের প্রায় দ্বিগুণ। শুধু উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডেই এ ধরনের আবাসনে রয়েছেন ১৬ হাজার ৩৪৯ জন।
অন্য দিকে আশ্রয়ের আবেদন ২১ শতাংশ কমে প্রায় ৮৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে এবং আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা মামলার জট এক বছরে ৫৬ শতাংশ কমে ৪০ হাজার ১৬৮ হয়েছে। ব্রিটেনে থাকার অধিকার নেই এমন ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর সংখ্যাও ৮ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৪১ হাজার হয়েছে; এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার বিদেশি অপরাধী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের দাবি, আশ্রয় আবেদনের জট ও হোটেলে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কমছে, অবৈধ কাজে ধরপাকড় রেকর্ড পর্যায়ে এবং প্রত্যাবাসনও বেড়েছে। তবে তাঁর স্বীকারোক্তি, কাজ এখনও শেষ হয়নি।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি আর স্থায়ী বসবাসের অনুমতির রেকর্ড, দুই বিপরীত ছবিই তাই এখন ব্রিটিশ সরকারের সামনে। এক দিকে সীমান্তে কড়াকড়ি, অন্য দিকে প্রতি মিনিটে একজনের স্থায়ী হওয়ার পথ বা নাগরিকত্ব–নতুন পরিসংখ্যান ব্রিটেনের অভিবাসন বিতর্ককে আরও এক ধাপ উত্তপ্ত করল।







