কেন বইপাগল ফরাসিরা

সংগৃহীত ছবি
প্যারিসের সকাল অন্য রকম। ব্যস্ত শহরের মানুষ ছুটছে নিজ নিজ গন্তব্যে। কেউ অফিসে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ ব্যবসার কাজে। কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেও একটি দৃশ্য খুব পরিচিত। মেট্রোর কামরায় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কেউ পড়ছেন উপন্যাস, কেউ ইতিহাসের বই, কেউ আবার ডুবে আছেন দর্শনের পাতায়। চারপাশের কোলাহল যেন তাদের কাছে পৌঁছায় না। বইয়ের সঙ্গে তাদের এই নীরব সম্পর্ক ফ্রান্সের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। ফ্রান্সকে বলা হয় শিল্প, সাহিত্য ও চিন্তার দেশ। এই পরিচয়ের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পাঠসংস্কৃতি। এখানে বই শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের চিন্তা গঠন, সমাজ বোঝা এবং নিজের অবস্থান তৈরি করার একটি উপায়। তাই ফরাসিদের বইপ্রীতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলাদা আগ্রহ রয়েছে। ফরাসি সমাজে বইয়ের প্রতি এই ভালোবাসা হঠাৎ তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস। ইউরোপের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে ফ্রান্স দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে অষ্টাদশ শতকের আলোকায়ন যুগে ফরাসি লেখক ও দার্শনিকরা মানুষের চিন্তার জগতে বড় পরিবর্তন আনেন।
ভলতেয়ার, রুশো ও মন্তেস্কুর মতো চিন্তাবিদরা তাদের লেখার মাধ্যমে মানুষকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন। রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম, স্বাধীনতা ও মানুষের অধিকার নিয়ে তাদের ভাবনা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং পুরো ইউরোপের চিন্তার গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসের সঙ্গেও বইয়ের সম্পর্ক গভীর। বিপ্লবের আগে সাধারণ মানুষের হাতে হাতে পৌঁছেছিল নানা ধরনের পুস্তিকা, প্রবন্ধ ও রাজনৈতিক লেখা। রাজতন্ত্র, বৈষম্য এবং মানুষের অধিকার নিয়ে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে লেখার মাধ্যমে। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, ফরাসি বিপ্লবের পেছনে অস্ত্রের পাশাপাশি কলমেরও বড় ভূমিকা ছিল। ফ্রান্সের সাহিত্য ঐতিহ্য পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ। ভিক্টর হুগো, অনরে দ্য বালজাক, আলেকজান্দ্র দ্যুমা, আলবেয়ার কামু, জ্যাঁ পল সার্ত্র ও সিমোন দ্য বোভোয়ারের মতো লেখকরা শুধু ফরাসি সাহিত্যকে নয়, বিশ্ব সাহিত্য ও দর্শনকে সমৃদ্ধ করেছেন।
ভিক্টর হুগোর লেখা “লে মিজেরাবল” মানবতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের এক অনন্য দলিল। আঁতোয়ান দ্য সাঁত একজুপেরির “দ্য লিটল প্রিন্স” বিশ্বের কোটি মানুষের প্রিয় বই। আলবেয়ার কামুর লেখা মানুষকে জীবনের অর্থ ও অস্তিত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
ফ্রান্সে লেখকদের প্রতি যে সম্মান দেখা যায়, সেটিও এই সংস্কৃতির একটি বড় দিক। একজন লেখক এখানে শুধু গল্প লেখেন না, তিনি সমাজের একজন চিন্তক হিসেবেও বিবেচিত হন। সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, বই প্রকাশ উপলক্ষে অনুষ্ঠান কিংবা লেখকের সঙ্গে পাঠকের সাক্ষাৎ ফরাসি সংস্কৃতির স্বাভাবিক অংশ।
প্যারিস শহর এই বইপ্রেমের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সেঁন নদীর তীরে পুরোনো বই বিক্রেতাদের ছোট ছোট দোকান শহরের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে। শত বছরের পুরোনো বইয়ের দোকানে ঢুকলে পাওয়া যায় ইতিহাসের গন্ধ। নতুন বইয়ের পাশাপাশি পুরোনো বইয়ের প্রতিও ফরাসিদের আলাদা টান রয়েছে।
প্যারিসের বিবলিওথেক নাসিওনাল দ্য ফ্রঁস বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাগার। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে বিপুল সংখ্যক বই, পাণ্ডুলিপি, সংবাদপত্র ও ঐতিহাসিক দলিল। শুধু গবেষক নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও এটি জ্ঞানের এক বিশাল ভাণ্ডার।
ফরাসিদের বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয় ছোটবেলা থেকেই। পরিবারে শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া হয় খুব অল্প বয়সে। গল্পের বই পড়ে শোনানো, জন্মদিনে বই উপহার দেওয়া কিংবা ছুটির দিনে লাইব্রেরিতে যাওয়া অনেক পরিবারের নিয়মিত অভ্যাস।
ফ্রান্সের শিক্ষা ব্যবস্থাও পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রাখে। এখানে শিক্ষার্থীদের শুধু মুখস্থ করতে উৎসাহ দেওয়া হয় না, বরং বিশ্লেষণ করতে শেখানো হয়। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে দর্শন পড়ানো হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা জীবন, নৈতিকতা, স্বাধীনতা ও সমাজ নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ পায়।
এই শিক্ষা পদ্ধতি একজন শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করে না, তাকে একজন চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। আর চিন্তার এই চর্চার সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ফ্রান্সে বইয়ের দোকানের সংস্কৃতিও আলাদা। বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট স্বাধীন বইয়ের দোকানগুলো এখনো টিকে আছে। ১৯৮১ সালে চালু হওয়া লাং আইন নতুন বইয়ের দাম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ছোট বইয়ের দোকানগুলোকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছে। ফলে বই বিক্রির ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য বজায় রয়েছে।
ফরাসি সরকার বই ও পাঠসংস্কৃতিকে সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে। গ্রন্থাগার, সাহিত্য উৎসব এবং পাঠ কার্যক্রমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বইয়ের সঙ্গে যুক্ত রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে সময় বদলেছে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন বিনোদনের কারণে তরুণদের পড়ার অভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো দীর্ঘ সময় ধরে বই পড়ার প্রবণতা কিছুটা কমেছে। কিন্তু তারপরও ফ্রান্সে বইয়ের সামাজিক মর্যাদা অটুট রয়েছে।
কারণ ফরাসিদের কাছে বই শুধু একটি পণ্য নয়। এটি চিন্তার স্বাধীনতা, কল্পনার শক্তি এবং নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনের একটি মাধ্যম। একটি বই একজন মানুষকে যেমন বদলে দিতে পারে, তেমনি একটি সমাজের ভাবনার দিকও পরিবর্তন করতে পারে, এমন বিশ্বাস তাদের মধ্যে গভীরভাবে রয়েছে। ফ্রান্সের রাস্তায় আজও তাই বই হাতে মানুষ দেখা যায়। মেট্রোর ভিড়ে, ক্যাফের টেবিলে কিংবা নদীর ধারে বসে থাকা পাঠকরা যেন জানান দেন, আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও বইয়ের জায়গা হারায়নি। বইয়ের সঙ্গে ফরাসিদের এই সম্পর্ক আসলে একটি জাতির দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রার গল্প। যে জাতি শত শত বছর ধরে বইকে জ্ঞান, স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতার প্রতীক হিসেবে ধরে রেখেছে, তাদের কাছে বইপ্রীতি শুধু অভ্যাস নয়, এটি জীবনধারার অংশ।







