বৃষ্টি উধাও, পুড়ছে ফসল
কৃষিতে বিপদের ঘণ্টা ব্রিটেনে
- রেকর্ড শুষ্ক জুলাইয়ে ইংল্যান্ডের অর্ধেক খরাগ্রস্ত
- কোথাও ফলন ৩০ শতাংশ কম, কোথাও অর্ধেক
- আমদানি ও খাদ্যমূল্য বাড়ার আশঙ্কা

হঠাৎ করেই পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে জমি, সপ্তাহের পর সপ্তাহ বৃষ্টি নেই ব্রিটেনে। ছবি: রয়টার্স
লাল-সবুজ ফসল কাটার যন্ত্রটি যখন সাফোকের শুকিয়ে যাওয়া খেতের মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছিল, চারপাশে ধুলোর বিশাল মেঘ। দৃশ্যটিই বলে দিচ্ছিল, এ বছরের ফসল স্বাভাবিক হয়নি।
ব্রিটিশ কৃষক জন পসি বলছেন, তার জমি যেন হঠাৎ করেই পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ বৃষ্টি নেই। খরা এত দীর্ঘ হয়েছে যে ওট, গম, ভেচসহ বিভিন্ন ফসলের ফলন স্বাভাবিকের তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কম।
ইংল্যান্ডে এবার জুলাই ছিল আবহাওয়া দপ্তরের নথিভুক্ত ইতিহাসে সবচেয়ে শুষ্ক জুলাই। একের পর এক তাপপ্রবাহের সঙ্গে বৃষ্টিহীনতা মিলে কৃষিজমির আর্দ্রতা দ্রুত কমিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যেই খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়েছে ব্রিটেনে।
গত ২৯ জুলাই ব্রিটিশ পরিবেশ সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ইংল্যান্ডের সাতটি অঞ্চল খরায় পুড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে ইস্ট অ্যাংলিয়া, লন্ডন ও হার্টফোর্ডশায়ার, টেমস ভ্যালি, হ্যাম্পশায়ার ও আইল অব ওয়াইট, ডেভন ও কর্নওয়াল, ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস এবং ওয়েসেক্সের বিস্তীর্ণ এলাকা। অর্থাৎ ইংল্যান্ডের প্রায় অর্ধেকই এখন আনুষ্ঠানিক খরার আওতায়।
জুলাইয়ে দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি গড়ের মাত্র ৭ শতাংশ বৃষ্টি হয়েছে; দক্ষিণ ইংল্যান্ডের কিছু অংশে তা নেমে এসেছে মাত্র ১ শতাংশে। কোথাও ৪৯ থেকে ৫০ দিন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি হয়নি। একই সঙ্গে ইংল্যান্ডের ৭৮ শতাংশ নদীর প্রবাহ স্বাভাবিকের নিচে এবং জলাধারের মজুতও দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
গত পাঁচ বছরে এটি ইংল্যান্ডের তৃতীয় খরা। এর আগে ২০২২ এবং ২০২৫ সালেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল দেশটি। সরকারের ভাষায়, অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার শীতকালের পর এবার এসেছে অস্বাভাবিক গরম ও শুষ্ক গ্রীষ্ম।
৬২ বছর বয়সী জন পসির পরিবার উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে সাফোকে কৃষিকাজ করছে। তার স্কটিশ প্রপিতামহ কৃষি মন্দার সময় দক্ষিণে এসে সেখানে বসতি গড়েছিলেন।
কিন্তু দীর্ঘ পারিবারিক অভিজ্ঞতাতেও বর্তমান আবহাওয়া তাকে উদ্বিগ্ন করেছে। পসি জানিয়েছেন, ফসল কাটার যন্ত্র মাঠে নামানোর পরই তারা বুঝতে পারেন, আশঙ্কার সবটাই সত্যি হয়েছে, ফলন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কম। ভবিষ্যৎ বছরগুলো নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন।
এ বছর শুধু তার কুইনোয়ার পুরো ফসলই নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টির অভাবে বীজ ঠিকমতো বেড়ে উঠতে পারেনি; জমিতে টিকে ছিল মূলত আগাছা ও কাঁটাগাছ।
খরার আঘাত শুধু শস্যে নয়, দৈনন্দিন খাবারের উপকরণেও৷ রয়্যাল এগ্রিকালচারাল কলেজের অধ্যাপক নিকোলা ক্যানন জানিয়েছেন, এ বছরের মটরশুঁটির ফলন প্রত্যাশার মাত্র ৫০ শতাংশ। মার্চের পর থেকে মাটিতে আর্দ্রতা এত কম ছিল যে গাছগুলোর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠারই সুযোগ হয়নি।
ক্যানন ব্রিটিনে সয়াবিন চাষ নিয়েও পরীক্ষা চালাচ্ছেন। তার মতে, জলবায়ু বদলালে ব্রিটেনের খাদ্যাভ্যাসও বদলাতে হতে পারে। যে ফসল ঐতিহ্যগতভাবে ব্রিটেনে চাষ হতো, সেগুলোর কিছু ভবিষ্যতে ফলানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে; একই সাথে গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় টিকে থাকতে পারে এমন ফসলের দিকে ঝুঁকতে হবে।
খরার প্রভাব ইতিমধ্যে বাজারেও দেখা যাচ্ছে। ব্রিটিশ কৃষক সংগঠনগুলোর মতে, অনেক এলাকায় গমগাছ স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় অর্ধেক উচ্চতা পর্যন্ত বাড়ছে। গম ও বার্লির ফলনও দশ বছরের গড়ের নিচে। তাপ ও খরার কারণে বহু কৃষক স্বাভাবিক সময়ের দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগেই ফসল কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন।
সবজি খাতে পরিস্থিতি আরও চাপের। ব্রিটেনের নিজস্ব উৎপাদনের মৌসুম চলার মধ্যেই পাব, রেস্তোরাঁ ও সুপারমার্কেটকে স্পেন থেকে লেটুস ও ব্রকলি আমদানি করতে হচ্ছে। পাইকারি বাজারে টমেটোর দাম ৬০ শতাংশের বেশি, আইসবার্গ লেটুসের দাম প্রায় ৯০ শতাংশ এবং আলুর দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলে ব্রিটিশ বাজারের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিছু ব্রকলি উৎপাদকের ফলন কমেছে প্রায় অর্ধেক।
জাতীয় কৃষক ইউনিয়নের সভাপতি টম ব্র্যাডশ সতর্ক করেছেন, খরা চলতে থাকলে নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যপণ্যের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
তার বক্তব্য, ব্রিটেন দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য সরবরাহকে খুব সহজলভ্য ও নিশ্চিত বিষয় বলে ধরে নিয়েছে। কিন্তু দেশ যেসব বিদেশি বাজার থেকে ফল ও সবজি আমদানি করে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সেসব দেশেও পড়ছে। অর্থাৎ ঘাটতি হলে শুধু আমদানি বাড়িয়েই সমস্যা মেটানো যাবে, এই পুরোনো ধারণাও ঝুঁকির মুখে।
ব্র্যাডশ সরকারের কাছে কৃষিজমিতে পানি সংরক্ষণের অবকাঠামো তৈরিতে কর ছাড় ও সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। তার যুক্তি, খরার বছরে সেচের পানি না থাকলে কৃষকের হাতে ফসল বাঁচানোর উপায় থাকে না।
খরা এখন শুধু কৃষকের সমস্যা নয়। সাতটি পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ গ্রাহকের জন্য অস্থায়ী পানি ব্যবহারের বিধিনিষেধ চালু করেছে, যা ইংল্যান্ডের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ।
নদী থেকে সেচের পানি তোলার ক্ষেত্রেও এক হাজার ৫০০-এর বেশি লাইসেন্সে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের নিজস্ব পানি সংরক্ষণাগার দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ায় বছরের বাকি সময়ে সেচের পানি থাকবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
সরকার বলছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি অবকাঠামোয় রেকর্ড বিনিয়োগ এবং নয়টি নতুন জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের দপ্তরের বক্তব্য, খাদ্যনিরাপত্তা এখন জাতীয় নিরাপত্তারই অংশ।
তবে শুধু নতুন জলাধার দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ টিমোথি বেন্টন।
তার মতে, কৃষিকে কম নিবিড়, আরও বৈচিত্র্যময় এবং পুনর্ব্যবহারনির্ভর ব্যবস্থায় নিয়ে যেতে হবে। ফল ও সারসহ আমদানিনির্ভর উপকরণের উপর নির্ভরতা কমাতে পারলে খাদ্যব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়বে। জলবায়ুর অভিঘাত সামনে আরও বাড়বে, তাই খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থাকেও বদলাতে হবে।
পসি নিজের জৈব খামারে এরই মধ্যে ছোলা ও ফাভা বিনের মতো অপেক্ষাকৃত গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় টিকে থাকা ফসলের পরীক্ষা শুরু করেছেন। একই জমিতে দুই ধরনের ফসল পাশাপাশি লাগিয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে গাছের শক্তি ও সহনশীলতা বাড়ানোর কৌশলও ব্যবহার করছেন তিনি।
তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু বিপদ নয়; কৃষক দ্রুত বদলাতে পারলে তা নতুন ফসল ও নতুন পদ্ধতির সুযোগও তৈরি করতে পারে। তবে সেই রূপান্তরের খরচ কৃষকের একার পক্ষে বহন করা কঠিন।
সমস্যার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক অর্থনীতি। ফলন কমলে কৃষকের আয় কমে। আয় কমলে খরা মোকাবিলায় নতুন জলাধার, আধুনিক সেচব্যবস্থা কিংবা নতুন ফসল নিয়ে পরীক্ষা করার পুঁজি থাকে না। ফলে একটি খারাপ মৌসুম পরের খারাপ মৌসুমকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে।
ব্রিটিশ কৃষির উপর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমনিতেই চাপ বাড়ছিল। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বন্যা ও খরার মতো চরম আবহাওয়া, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং কৃষি সহায়তার পরিবর্তনের পর অনেক খামার লোকসান বা কোনোমতে খরচ তুলে টিকে আছে। কৃষি সংগঠনের নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, কিছু কৃষকের জন্য এবারের ফসলই শেষ ফসল হয়ে উঠতে পারে।
পসির সতর্কবার্তা আরও স্পষ্ট–এই আবহাওয়ার ধারা চলতে থাকলে কৃষকেরা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবেন। তখন হয় খাবারের দাম বাড়বে, নয়তো কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে আরও বেশি অর্থ ঢালতে হবে।
ব্রিটেনের বর্তমান খরা তাই শুধু একটি সাধারণ গ্রীষ্মের গল্প নয়৷ মাঠে আজ যে ধুলো উড়ছে, তার হিসাব আগামী মাসে পৌঁছতে পারে সুপারমার্কেটের তাকেও।




