ইউরোপ জুড়ে একের পর এক ফ্লাইটে বোমা হামলার হুমকি, নেপথ্যে কী

ছবি: রয়টার্স
ইউরোপ জুড়ে বিভিন্ন বিমান সংস্থা বৃহস্পতিবার নতুন করে বোমা হামলার হুমকি পেয়েছে। চলতি সপ্তাহে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো এমন ঘটনা ঘটল। এর জেরে কয়েকটি ফ্লাইটকে নির্ধারিত গন্তব্যের বাইরে অন্য বিমানবন্দরে অবতরণ করতে হয়েছে। অন্য কয়েকটি ফ্লাইটকে পাহারা দিয়ে নিয়ে গেছে যুদ্ধবিমান। তবে এখন পর্যন্ত কোনো হুমকির সত্যতা মেলেনি।
৫ নভেম্বর আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন থেকে ইতালির রোমগামী অ্যার লিঙ্গাসের একটি ফ্লাইট বোমা হামলার হুমকিতে ফ্রান্সে অবতরণ করে। একই দিনে ফিনএয়ারের হেলসিঙ্কি-রোম এবং লট পোলিশ এয়ারলাইনসের ওয়ারশ-ব্রাসেলসগামী ফ্লাইটেও বোমার হুমকি দেওয়া হয়।
এ ছাড়া রায়ানএয়ারের চারটি ফ্লাইটে ৩ নভেম্বর হুমকি আসে। এতে ইতালি, স্পেন ও বুলগেরিয়ায় নিরাপত্তা তল্লাশি চালানো হয়। অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইনস, এসএএস ও উইজ এয়ারের কয়েকটি ফ্লাইটও সাম্প্রতিক সময়ে একই ধরনের হুমকির মুখে পড়ে। এসব ঘটনায় যাত্রী ও ক্রুদের নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে উড়োজাহাজ ও লাগেজে তল্লাশি চালানো হয়। তবে কোনো বিস্ফোরক বা বিপজ্জনক বস্তু পাওয়া যায়নি।
কেউ এসব ঘটনার দায় স্বীকার করেনি। এ ছাড়া কর্মকর্তারাও কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী করেননি।
বিমান সংস্থাগুলোর জন্য বোমা হামলার হুমকি নতুন কিছু নয়। তবে চলমান ঘটনাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সেগুলোর সময়ের মিল অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন উড়োজাহাজ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
বিমান সংস্থা ও যাত্রীরা কী ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন, তা নিচে তুলে ধরা হলো।
সাধারণত কীভাবে বোমা হামলার হুমকি দেওয়া হয়?
বিমানে বোমা হামলার হুমকি প্রায়ই বেনামি ই-মেইল বা ফোনকলের মাধ্যমে বিমান সংস্থা, বিমানবন্দর কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। এসব বার্তায় দাবি করা হয়, উড়োজাহাজে বিস্ফোরক রয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এবং অন্যদের একই ধরনের কাজ করতে উৎসাহিত করা ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ সবসময় হুমকি পাঠানোর পদ্ধতি প্রকাশ করে না।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একাধিক ফ্লাইটে বোমা হামলার হুমকি, সাময়িক বন্ধ বিমানবন্দর
০৩ নভেম্বর ২০২৬
সিএনএনকে বৃহস্পতিবার প্রাগ বিমানবন্দরের এক প্রতিনিধি জানান, বিমানবন্দরের ঠিকানায় পাঠানো একটি বেনামি ই-মেইলে তারা হুমকি পেয়েছেন। চেক পুলিশ জানিয়েছে, ইউরোপের অন্য বিমানবন্দরগুলোতেও একই ধরনের ই-মেইল পাঠানো হয়েছে।
বিমান নিরাপত্তা সংস্থা ডায়ামির প্রধান এরিক স্কাউটেন রয়টার্সকে বলেন, প্রথমে বিমান সংস্থার নিরাপত্তা বিভাগ একটি নির্ধারিত তালিকা অনুসরণ করে হুমকির তথ্য যাচাই করে। এরপর কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন হলে যুদ্ধবিমান পাঠাতে পারে অথবা উড়োজাহাজটিকে নির্ধারিত কোনো বিমানবন্দরে অবতরণ করিয়ে পূর্ণাঙ্গ তল্লাশি চালাতে পারে।
ঝুঁকি কতটা?
বোমা হামলার অধিকাংশ হুমকিই শেষ পর্যন্ত ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি হুমকিকেই সত্য বলে ধরে নিতে হয়।
চলতি সপ্তাহে যেসব উড়োজাহাজ হুমকির মুখে পড়েছে, সেগুলোর কোনোটিতেই বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিটি বিমান সংস্থাকেই হুমকির বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়।
ব্রিটিশ সরকারের এক মুখপাত্র চলতি সপ্তাহের ঘটনাগুলোকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুয়া হুমকি’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বললেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিমান নিরাপত্তাব্যবস্থাগুলোর একটি রয়েছে’ যুক্তরাজ্যের।
কারা থাকতে পারে এর পেছনে?
এ বিষয়ে কেউ নিশ্চিতভাবে কিছু জানে না।
ওসপ্রে ফ্লাইট সলিউশনসের রিস জোনস বলেন, রাজনৈতিক অসন্তোষ, আন্দোলনকারীদের প্রচারাভিযান, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, অনলাইন গোষ্ঠী কিংবা রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট হাইব্রিড তৎপরতাসহ নানা কারণে বোমা হামলার হুমকি দেওয়া হতে পারে।
তবে চলতি সপ্তাহের ঘটনাগুলোর সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা সংগঠনের যোগসূত্র রয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
বিমান সংস্থাগুলোর ওপর কী প্রভাব পড়ছে?
ভুয়া হুমকিও বিমান সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। উড়োজাহাজের গতিপথ পরিবর্তন এবং বিস্তারিত নিরাপত্তা তল্লাশির কারণে যাত্রীদের বিলম্বের মুখে পড়তে হয়। এ ছাড়া অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, যাত্রীদের অন্য ফ্লাইটে বুকিং, কর্মীদের দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন এবং উড়োজাহাজের গতিপথ পরিবর্তনের কারণে বিমান সংস্থাগুলোকে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হয়।
স্কাউটেন বলেন, পূর্ণাঙ্গ তল্লাশির জন্য যাত্রী ও মালপত্র উড়োজাহাজ থেকে নামিয়ে সেটি পরীক্ষা করতে হয়। এরপর আবার সবাইকে উড়োজাহাজে তুলতে হয়। এতে ক্রুদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টার সীমা অতিক্রম করতে পারে। ফলে যাত্রীদের সংযোগকারী ফ্লাইট মিস করা এবং ফ্লাইট বাতিলের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়।
এয়ার ফ্রান্স-কেএলএমের প্রধান নির্বাহী বেন স্মিথ বৃহস্পতিবার বলেন, এত সমন্বিতভাবে হুমকি দেওয়ার ঘটনা তিনি আগে কখনো দেখেননি।
সাংবাদিকদের স্মিথ বললেন, ‘আমাদের কার্যক্রমে যাতে এর প্রভাব খুব সামান্য বা একেবারেই না পড়ে, তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে বলে আমরা যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। তাই এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য আজ আমাদের সরকারের কাছে কোনো অনুরোধ নেই।’




