কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপকের মৃত্যুতে ‘বর্ণবাদী উইচ-হান্ট’ নিয়ে তোলপাড় ব্রিটেন
- কেমব্রিজের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক ছিলেন জেসন আরডে
- পদত্যাগের ৯ দিনের মাথায় মৃত্যু, কীভাবে পরিস্থিতি এত দূর গেল তা নিয়ে ‘আত্মসমীক্ষা’র ডাক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর

সংগৃহীত ছবি
চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। প্রশ্ন উঠেছিল ব্যক্তিগত সাফল্যের কয়েকটি দাবি নিয়েও। কিন্তু সেই অনুসন্ধান কি একপর্যায়ে একজন কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষাবিদকে লক্ষ্য করে ‘বর্ণবাদী উইচ-হান্টে’ পরিণত হয়েছিল? কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক জেসন আরডের আকস্মিক মৃত্যুর পর এই প্রশ্নেই এখন তীব্র বিতর্ক ব্রিটেনে।
‘উইচ-হান্ট’ বলতে বোঝায়, কাউকে দোষী প্রমাণের আগেই তাকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক অভিযোগ, আক্রমণ, অপমান বা সামাজিকভাবে কোণঠাসা করার অভিযান। আরডের ক্ষেত্রে বর্ণবাদবিরোধী কয়েকটি সংগঠন ও শিক্ষাবিদের অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্তের সীমা ছাড়িয়ে এমনই একটি প্রচারাভিযান চলেছিল, যেখানে নিশানা হয়েছিল তার কৃষ্ণাঙ্গ পরিচয়ও।
৪১ বছর বয়সী আরডেকে গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের ব্যাটারসির একটি ঠিকানায় নিথর অবস্থায় পাওয়া যায়। বিকেল তিনটার কিছু পর জরুরি সেবা পৌঁছলেও তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, মৃত্যু অপ্রত্যাশিত হলেও আপাতত সন্দেহজনক হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
এর মাত্র নয় দিন আগে গত ৫ আগস্ট কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অনুষদের অধ্যাপক পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন আরডে। ২০২৩ সালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তিনি কেমব্রিজের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক হন। তার নিয়োগকে তখন ব্রিটিশ উচ্চশিক্ষায় বৈচিত্র্য ও প্রতিনিধিত্বের বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়েছিল।
কী অভিযোগ উঠেছিল
চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষ দিকে তার ২০১৫ সালের পিএইচডি গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ ছিল, তার অভিসন্দর্ভের শতাধিক অনুচ্ছেদের সঙ্গে আগের একটি গবেষণাপত্রের মিল রয়েছে। আরডে ইচ্ছাকৃত চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ অস্বীকার করলেও গবেষণায় কিছু ভুল থাকার কথা স্বীকার করেছিলেন।
যে লিভারপুল জন মুরস বিশ্ববিদ্যালয় তাকে পিএইচডি দিয়েছিল, প্রতিষ্ঠানটি আগের একটি পর্যালোচনার পর তার ডিগ্রি বহাল রাখে। পরে তার দাতব্য কাজের জন্য ৫৫ লাখ পাউন্ড সংগ্রহ, ৩৫ দিনে ৩০টি ম্যারাথন এবং ছয় দিনে ৬০০ মাইল অতিক্রমের মতো কয়েকটি দাবি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কিছু দাবি পরে সংশোধন করেছিলেন তিনি।
কেন উঠছে বর্ণবাদের প্রশ্ন
সমালোচকেরা বলেছেন, অভিযোগ যাচাই করা স্বাভাবিক হলেও আরডেকে ঘিরে প্রচারের মাত্রা ছিল অস্বাভাবিক। একটি গণমাধ্যম পর্যবেক্ষক সংস্থার হিসাবে, মাত্র নয় দিনে তাকে নিয়ে অন্তত ১৮৮টি সংবাদ ও নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।
ব্রিটেনের ন্যাশনাল এডুকেশন ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ড্যানিয়েল কেবেডের অভিযোগ, আরডেকে ঘিরে প্রকাশ্য আক্রমণ একসময় ‘বর্ণবাদের স্রোত’ উসকে দেয়। বর্ণবাদবিরোধী সংগঠন স্ট্যান্ড আপ টু রেসিজম ঘটনাটিকে সরাসরি ‘বর্ণবাদী উইচ-হান্ট’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
লন্ডনের মেয়র সাদিক খান বলেছেন, আরডেকে যে মাত্রার প্রকাশ্য অপমান ও আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল, একই অবস্থানে থাকা অন্য অনেককে হয়তো তা সহ্য করতে হতো না। লেবার এমপি বেল রিবেইরো-অ্যাডিও প্রশ্ন তুলেছেন, গবেষণা-অনিয়মের অভিযোগ ওঠা শ্বেতাঙ্গ শিক্ষাবিদদের ক্ষেত্রে কেন একই ধরনের গণমাধ্যম ঝড় দেখা যায়নি।
জেসন আরডের মৃত্যুর পর সেই ক্ষোভ এবার রাজপথেও গড়াচ্ছে। বর্ণবাদবিরোধী সংগঠন স্ট্যান্ড আপ টু রেসিজম তার স্মরণে সোমবার (১৭ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টায় লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে ন্যাশনাল গ্যালারিতে স্মরণসভা ও প্রহরের আয়োজন করেছে। সংগঠনটির সহ-আহ্বায়ক ওয়েম্যান বেনেট অভিযোগ করেছেন, আরডেকে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম, রাজনীতিক ও উগ্র ডানপন্থীরা এমনভাবে নিশানা করেছিল, যা তাদের ভাষায় একটি ‘বর্ণবাদী উইচ-হান্ট’। সংগঠনটির বক্তব্য, কৃষ্ণাঙ্গরা যোগ্যতার বদলে কেবল বর্ণের কারণে উচ্চপদে নিয়োগ পান এমন ধারণাও এই প্রচারের মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। এদিকে আরডের পরিবারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ে সহায়তার জন্য উইন্ডরাশ আন্দোলনকর্মী স্যার প্যাট্রিক ভার্ননের উদ্যোগে তহবিল সংগ্রহও শুরু হয়েছে; রবিবার সকাল নাগাদ সেখানে ৪০ হাজার পাউন্ডের বেশি জমা পড়েছে।
মৃত্যুর দিনও ছিলেন বিপর্যস্ত
আরডের বন্ধু ও কেমব্রিজের অটিজম রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক সাইমন ব্যারন-কোহেন জানিয়েছেন, মৃত্যুর দিন সকালেও তার সঙ্গে আরডের যোগাযোগ হয়েছিল। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাগাতার সমালোচনা ও উপহাস তাকে গভীরভাবে বিপর্যস্ত করেছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।
আরডের পরিবারও বলেছে, কেমব্রিজে যোগ দেওয়ার পর থেকে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে হয়রানি, অপপ্রচার ও আক্রমণের মুখে ছিলেন।
‘আত্মসমীক্ষা’ চান প্রধানমন্ত্রী
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম আরডের মৃত্যুকে ‘বহু দিক থেকেই মর্মান্তিক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্য, এখন দ্রুত কাউকে দায়ী করার সময় নয়; বরং কীভাবে ঘটনাপ্রবাহ এমন পরিণতিতে পৌঁছাল, তা গভীরভাবে ভেবে দেখা প্রয়োজন।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় আরডের নিয়োগপ্রক্রিয়া ও সেখানে তার কর্মকাল নিয়ে স্বাধীন তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডেবোরা প্রেন্টিস তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন।
তবে বিতর্কে ভিন্ন মতও রয়েছে। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কৃষ্ণাঙ্গ কনজারভেটিভ এমপি জেমস ক্লেভারলি মনে করেন, আরডেকে বৈচিত্র্যের সাফল্যের প্রতীক বানাতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাকে এমন উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বে ঠেলে দিয়েছিল, যার জন্য তার প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তার মতে, দায় শুধু সমালোচকদের নয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোরও।
একটি বিষয় অবশ্য এখনও পরিষ্কার, বর্ণবাদ বা গণমাধ্যমের চাপকে আরডের মৃত্যুর কারণ হিসেবে পুলিশ কিংবা কোনও আনুষ্ঠানিক তদন্ত চিহ্নিত করেনি। ফলে ‘বর্ণবাদী উইচ-হান্ট’ কথাটি অধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ ও কয়েকজন রাজনীতিকের অভিযোগ; তদন্তের সিদ্ধান্ত নয়।
তার পরও আরডের মৃত্যু ব্রিটিশ সমাজের সামনে অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে গেল, একজন কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষাবিদের ভুল বা অভিযোগের বিচার কোথায় শেষ হয়, আর কোথা থেকে শুরু হয় তার পরিচয়কে নিশানা করে প্রকাশ্য অপমান? এখন সেই প্রশ্নেই বর্ণবাদ, সংবাদমাধ্যমের দায় এবং ব্রিটিশ উচ্চশিক্ষায় কৃষ্ণাঙ্গদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।






