রুশ ‘ছায়া বহরে’ ব্রিটেনের হানা, পুতিনের পাল্টা হুঁশিয়ারি

ছবি: রয়টার্স
রাশিয়ার কথিত ‘ছায়া বহর’-এর তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দ ঘিরে মস্কো ও লন্ডনের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো রুশ জাহাজ আটক করলে পাল্টা তাদের জাহাজও জব্দ করা হবে–রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এমন হুঁশিয়ারির পর নিজেদের পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই দিল ব্রিটেন। লন্ডনের বক্তব্য, রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর নৌবহরের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন মেনেই হয়েছে।
ব্রিটিশ সরকারের এক মুখপাত্র বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে মস্কোকে অর্থ জোগাচ্ছে এমন ‘ছায়া বহর’ এবং তাদের ক্ষতিকর সামুদ্রিক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে ব্যবস্থা নিচ্ছে যুক্তরাজ্য। সরকারের দাবি, এসব পদক্ষেপ আইন মেনেই নেওয়া হচ্ছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে স্মাইরটোস নামের একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার। গত ১৪ জুন রয়্যাল মেরিন কমান্ডো এবং ব্রিটেনের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির বিশেষ প্রশিক্ষিত কর্মকর্তারা ইংলিশ চ্যানেলে জাহাজটিতে ওঠেন। রাশিয়ার ছায়া বহরের বিরুদ্ধে এটিই ছিল ব্রিটেনের নেতৃত্বে প্রথম এমন অভিযান। পরে ট্যাঙ্কারটিকে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে ওয়েমাউথের কাছে নোঙর করিয়ে তদন্ত শুরু হয়। অভিযানটি ফ্রান্সের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে পরিচালিত হয়েছিল।
সেই অভিযান হয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারের সময়ে। বর্তমানে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম; তিনি ২০ জুলাই দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে নতুন সরকারও রুশ ছায়া বহরের বিরুদ্ধে আগের কঠোর অবস্থানই বজায় রেখেছে।
ব্রিটিশ সরকারের হিসাবে, সাত শতাধিক জাহাজ নিয়ে গড়ে ওঠা রাশিয়ার এই ছায়া বহর নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ তেলের প্রায় ৭৫ শতাংশ বহন করে। পুরনো জাহাজ, অস্বচ্ছ মালিকানা, পতাকা বদল এবং পশ্চিমা বিমা ব্যবস্থার বাইরে থেকে তেল পরিবহণের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটানোই এই বহরের প্রধান উদ্দেশ্য বলে অভিযোগ পশ্চিমা দেশগুলোর। ওই তেল বিক্রির অর্থ ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ চালাতে সহায়তা করছে বলে দাবি লন্ডনের।
স্মাইরটোস জব্দের আইনি ভিত্তিও ব্যাখ্যা করেছে ব্রিটিশ সরকার। জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদ ইউএনসিএলওএস-এর ১১০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনও জাহাজ রাষ্ট্রহীন বা বৈধ জাতীয়তা নেই বলে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ হলে যুদ্ধজাহাজ সেটি পরীক্ষা করতে পারে। ব্রিটিশ সরকারের দাবি, স্মাইরটোসের ক্ষেত্রে সেই আইনি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এরপর ব্রিটেনের রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা আইন এবং সামুদ্রিক আইন প্রয়োগের ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়।
ট্যাঙ্কারটির ক্যাপ্টেন ৩৮ বছর বয়সী ভারতীয় নাগরিক অজয় পান্ত-এর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। ব্রিটিশ কৌঁসুলিদের অভিযোগ, তিনি জাহাজের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে নিষিদ্ধ তেল বা তেলজাত পণ্য তৃতীয় একটি দেশে সরবরাহ বা পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মামলাটি বিচারাধীন এবং অভিযোগের বিষয়ে তাঁর ন্যায্য বিচারের অধিকার রয়েছে বলে জানিয়েছে ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস।
এই ঘটনার দু’মাস পর এ বার সরাসরি পাল্টা হুমকি দিলেন পুতিন। রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের মহড়া পর্যবেক্ষণের সময় তিনি অভিযোগ করেছেন, ইউরোপের কয়েকটি দেশ আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন লঙ্ঘন করে রুশ বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল বাধাগ্রস্ত করছে এবং সেগুলো জব্দ করার কথাও ভাবছে। এমন পদক্ষেপকে তিনি ‘জলদস্যুতা ও লুটপাট’ বলে অভিহিত করেন।
পুতিনের হুঁশিয়ারি, রুশ জাহাজ জব্দ শুরু হলে মস্কোও একই কায়দায় জবাব দেবে। শুধু যে এলাকায় রুশ জাহাজ আটক হবে সেখানেই নয়, রাশিয়া যেখানে প্রয়োজন ও উপযুক্ত মনে করবে, সেখানেই পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে।
আরও এক ধাপ এগিয়ে রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের কমান্ডার ভিক্টর লিনা সরাসরি ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, পশ্চিমা দেশগুলোও নিজেদের পণ্য পরিবহণে তৃতীয় দেশের পতাকাবাহী জাহাজ ব্যবহার করে। রাশিয়া চাইলে ‘শত্রুভাবাপন্ন’ দেশগুলোর এমন জাহাজ পরীক্ষা ও আটক করতে সক্ষম। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর পথ, মালামাল ও মালিকানা সম্পর্কে মস্কোর কাছে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমধ্যসাগরীয় নৌ অভিযান ‘অপারেশন ইরিনি’-র সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, মূলত লিবিয়ার উপর জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে শুরু হওয়া ওই অভিযান এখন রুশ-সংশ্লিষ্ট জাহাজ তল্লাশির কাজে ব্যবহার করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। মস্কোর দাবি, এতে আন্তর্জাতিক আইনের অপব্যবহার হচ্ছে এবং বাণিজ্যিক নৌচলাচলের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে পুতিনের হুমকির পরও নীতি বদলের কোনও ইঙ্গিত দেয়নি লন্ডন। বরং গত ৬ আগস্ট আরও ছয়টি ছায়া বহরের ট্যাঙ্কারসহ রুশ ব্যাংক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে ব্রিটেন। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞার আওতায় ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজ মিলিয়ে সংখ্যা ইতিমধ্যে ৩,৪০০ ছাড়িয়েছে।
ফলে ছায়া বহর ঘিরে বিরোধ এখন আর শুধু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এক দিকে রুশ তেলের অর্থপ্রবাহে আঘাত করতে সমুদ্রে সরাসরি জাহাজ আটকানোর পথে এগোচ্ছে ব্রিটেন ও তার ইউরোপীয় মিত্রেরা; অন্য দিকে একই কায়দায় পশ্চিমা জাহাজ জব্দের প্রকাশ্য হুমকি দিল মস্কো। সমুদ্রে এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে রাশিয়া ও ইউরোপের সংঘাতকে নতুন এবং আরও ঝুঁকিপূর্ণ স্তরে নিয়ে যাচ্ছে।






