নতুন মহামারির ঝুঁকি আগেই শনাক্তে এআই গবেষণাগার গড়ছে ব্রিটেন
- বিশ্বের প্রথম নিবেদিত এআইভিত্তিক জৈবনিরাপত্তা গবেষণাগার গড়ার ঘোষণা
- টিকা ও চিকিৎসা উদ্ভাবনেও প্রযুক্তির সহায়তা
- সরকারের ১০ কোটি পাউন্ড বরাদ্দ, আরও ২০ কোটি পাউন্ড সমমূল্যের প্রযুক্তিসহায়তার প্রতিশ্রুতি

ছবি: রয়টার্স
জীবাণুর কোনো সীমান্ত নেই। নেই পাসপোর্ট। মানুষের চোখে অদৃশ্য সেই শত্রু একদিন থামিয়ে দিয়েছিল গোটা পৃথিবী। নিভেছিল অসংখ্য প্রাণ। স্তব্ধ হয়েছিল শহর। করোনার সেই দুঃস্বপ্ন এখনও মুছে যায়নি। এবার প্রশ্ন, পরবর্তী মহামারি আঘাত হানার আগেই কি তার বিপদচিহ্ন শনাক্ত করা সম্ভব? সেই আশায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের প্রথম নিবেদিত জৈবনিরাপত্তা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গড়ার ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটেন।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন প্রতিষ্ঠানটি অজানা রোগজীবাণুর ঝুঁকি শনাক্ত, সংক্রমণের হুমকি মূল্যায়ন এবং দ্রুত টিকা ও চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবনে কাজ করবে। ব্রিটিশ সরকার একে বর্ণনা করেছে বিশ্বের প্রথম নিবেদিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক জৈবনিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হিসেবে।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন গবেষণাগারের জন্য বরাদ্দ হচ্ছে ১০ কোটি পাউন্ড। প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ওপেনএআই দেবে ১০ কোটি পাউন্ড সমমূল্যের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা। অ্যানথ্রপিক দেবে সর্বোচ্চ আরও ১০ কোটি পাউন্ডের সুবিধা ও কারিগরি সহায়তা।
গবেষণায় সহযোগিতা করবে গুগল ডিপমাইন্ড এবং ব্রিটিশ জীবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বেসক্যাম্প রিসার্চ। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হবে স্বতন্ত্র ও অলাভজনকভাবে। যুক্ত থাকবে ব্রিটেনের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা সংস্থা, প্রাণী ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্য সংস্থা এবং প্রতিরক্ষা গবেষণাগার। ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গেও কাজ করবে প্রতিষ্ঠানটি।
ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জন হিলি জানিয়েছেন, আগামী বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাজেট ঘোষণায় বিনিয়োগের বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। হিলি বলেছেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দেবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, জনপদ, হাসপাতাল, বিদ্যালয় এবং অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্র এর সুফল পেতে পারে।’ তবে সাধারণ মানুষের উদ্বেগও গুরুত্ব দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, ব্রিটেন এমন নিজস্ব কৌশল অনুসরণ করবে, যেখানে কর্মীরা পিছিয়ে পড়বেন না এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে।
দেশটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক মন্ত্রী কনিষ্ক নারায়ণ বলেছেন, নতুন গবেষণাগার হবে ‘বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি নতুন প্রতিষ্ঠান’। উদীয়মান জৈবিক হুমকি থেকে মানুষকে রক্ষায় বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীদের একত্র করাই এর লক্ষ্য।
শনিবারের ঘোষণা অনুযায়ী, রোগজীবাণু মোকাবিলার চিকিৎসা ও প্রতিরোধব্যবস্থা উন্নয়নে পৃথকভাবে রাখা হয়েছে আরও সাড়ে ছয় কোটি পাউন্ড। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ১২ কোটি পাউন্ড।
বিবিসি জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে ৬ কোটি পাউন্ডের জাতীয় সুরক্ষা কর্মসূচি এবং ৭ কোটি পাউন্ডের নতুন দুর্বলতা শনাক্তকরণ কেন্দ্র গড়বে সরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সাইবার হামলার ঝুঁকি খুঁজে বের করবে এই কেন্দ্র।
এর প্রেক্ষাপটে রয়েছে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সাইবার সংকট। বহুল ব্যবহৃত একটি কম্পিউটার ভাষায় গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি ধরা পড়ায় ব্রিটিশ সরকারের ৩২টি অনলাইন পরিষেবা সাময়িক বন্ধ রাখা হয়। নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তারও ভূমিকা ছিল।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নারায়ণ জানিয়েছেন, এর আগেও মাত্র ১৩ হাজার পাউন্ড খরচ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সরকারি ব্যবস্থায় ৫০০টি নতুন নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত করা হয়েছিল।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে করোনার কঠিন শিক্ষা। ২০২৩ সালে ব্রিটেনের জৈবনিরাপত্তা কৌশলে ভবিষ্যৎ মহামারি, জীবাণু অস্ত্র ও দুর্ঘটনাজনিত সংক্রমণ মোকাবিলায় প্রস্তুতি বাড়ানোর অঙ্গীকার করা হয়।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপরীত ঝুঁকিও রয়েছে। চিকিৎসা আবিষ্কারের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি একই প্রযুক্তির অপব্যবহার ক্ষতিকর জীবাণু তৈরির পথও সহজ করতে পারে।
বিরোধী কনজারভেটিভ দলের মুখপাত্র বেন স্পেনসার তাই সুস্পষ্ট নিরাপত্তা কৌশল ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিসহযোগিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক বিধি সমন্বয়ের কারণে মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ সংকুচিত হবে কি না, তার ব্যাখ্যা চেয়েছেন তিনি।
বিজ্ঞানীরা এখনও বলতে পারেন না, পরবর্তী মহামারি কবে আসবে। নতুন গবেষণাগারও তা নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারবে না। তবে বিপদের সংকেত আগেভাগে শনাক্ত এবং প্রতিষেধক তৈরির সময় কমানোই লক্ষ্য।
করোনা পৃথিবীকে শিখিয়েছে, অদৃশ্য জীবাণুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় লড়াই শুরু হয় রোগ ছড়িয়ে পড়ার আগেই। এবার সেই লড়াইয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চলেছে মানুষেরই তৈরি বুদ্ধিমান যন্ত্র। কিন্তু ইতিহাসের নতুন প্রশ্নটি এখানেই। যে প্রযুক্তির হাতে মানুষ তুলে দিচ্ছে ভবিষ্যতের মহামারি ঠেকানোর দায়িত্ব, সেই প্রযুক্তির ক্ষমতার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকবে তো?



