ফ্রান্সে বিতর্কের কেন্দ্রে এয়ার কন্ডিশনার

তীব্র গরমে বিপর্যস্ত ফ্রান্সের জনজীবন- রয়টার্স
রেকর্ড তাপপ্রবাহের মুখে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বহুদিনের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছে ফ্রান্স। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা এয়ার কন্ডিশনার।
তীব্র গরমে দেশজুড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় এ সপ্তাহে এয়ার কন্ডিশনার নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন করে জোরালো হয়েছে। কট্টর ডানপন্থী নেতা মেরিন ল্য পেন ভর্তুকি দিয়ে ব্যাপকভাবে এয়ার কন্ডিশনার স্থাপনের দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে দীর্ঘদিন এর বিরোধিতা করা পরিবেশবাদীরাও এখন স্বীকার করছেন, ভবিষ্যতে এর ব্যবহার এড়ানো কঠিন হবে।
বর্তমানে ফ্রান্সের মাত্র ২৫ শতাংশ পরিবারের ঘরে এয়ার কন্ডিশনার রয়েছে। তুলনায় স্পেন ও ইতালিতে এ হার ৫০ শতাংশ, আর যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে প্রায় ৯০ শতাংশ।
ফরাসি হাসপাতাল ও স্কুলগুলোর বেশিরভাগেও এয়ার কন্ডিশনার নেই। তীব্র গরমের কারণে এ সপ্তাহে হাজারো স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে। চিকিৎসক ও নার্সরাও বলছেন, হাসপাতালের পরিস্থিতি দ্রুত অসহনীয় হয়ে উঠছে।
দেশটির অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছেছে। মঙ্গলবার ফ্রান্সে ইতিহাসের সবচেয়ে গরম দিন রেকর্ড করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পোর্টেবল এয়ার কন্ডিশনার কিনছে, যাতে অন্তত শিশুরা কয়েক ঘণ্টা ক্লাস করতে পারে বা গরমে অতিষ্ঠ মানুষ রাতে কিছুটা স্বস্তিতে ঘুমাতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সের পরিবেশবাদীরা এয়ার কন্ডিশনারকে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ সমাধান হিসেবে দেখেছেন। তাদের যুক্তি ছিল, এটি সমস্যার মূল কারণ দূর না করে শুধু সাময়িকভাবে এর প্রভাব কমায়।
তাদের মতে, এতে মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত কারণ মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা থেকে দূরে সরে যেতে পারে। পাশাপাশি এয়ার কন্ডিশনার চালাতে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় এবং এতে ব্যবহৃত রেফ্রিজারেন্ট গ্যাসও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
তবে বাস্তবতা এখন অনেককে অবস্থান বদলাতে বাধ্য করছে।
ইকোলজিস্ট পার্টির নেতা মারি তন্দেলিয়ে সম্প্রতি বলেছেন, স্কুল ও হাসপাতালে এখন আর এয়ার কন্ডিশনার ছাড়া উপায় নেই। তার ভাষায়, ‘কিছু জায়গায় এটি এখন অপরিহার্য।’
এদিকে প্যারিস অঞ্চলের প্রশাসনিক প্রধান ভ্যালেরি পেক্রেস অভিযোগ করেছেন, সরকার এখনো ‘এয়ার কন্ডিশনারবিরোধী আদর্শে’ পরিচালিত হচ্ছে।
তার মতে, অন্যান্য শীতলীকরণ ব্যবস্থার পাশাপাশি এয়ার কন্ডিশনারকেও সমাধানের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তিনি ২০৩২ সালের মধ্যে প্যারিস অঞ্চলের সব বাস ও ট্রেনে এয়ার কন্ডিশনার স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
সবচেয়ে জোরালো অবস্থান নিয়েছে মেরিন ল্য পেনের ন্যাশনাল র্যালি (আরএন) দল। তারা স্কুল ও হাসপাতালে এয়ার কন্ডিশনার স্থাপনে জাতীয় কর্মসূচি চালুর দাবি জানিয়েছে।
দলটির প্রস্তাব অনুযায়ী, সাধারণ মানুষকে এয়ার কন্ডিশনার বসাতে সহায়তার জন্য ২০ বিলিয়ন ইউরোর সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হবে।
সমালোচকরা এই পরিকল্পনাকে রাজনৈতিক সুযোগ সন্ধানি বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা স্বীকার করতেই যাদের সবচেয়ে বেশি সময় লেগেছে, এখন তারাই এ সমস্যার সমাধান নিয়ে বড় বড় কথা বলছে।
তবে রাজনৈতিক বিতর্ক যাই থাকুক, ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ, বিপর্যস্ত স্কুল-হাসপাতাল এবং বাড়তে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ফ্রান্সে এয়ার কন্ডিশনারের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। অনেকের মতে, এখন আর প্রশ্ন এটি হবে কি না, বরং কত দ্রুত হবে সেটিই মূল বিষয়।






