চল্লিশে পা অসীমে চোখ

বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন মেসি
লিওনেল আন্দ্রেস মেসি আজ পা রাখলেন ৪০-এ। তবে চালশে হওয়ার কোনো লক্ষণই তার মধ্যে নেই। এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা করেছে পাঁচ গোল, সবই করেছেন মেসি। ২০০৬ বিশ্বকাপে মেসি যখন প্রথম আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে খেলেন, তখন সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে গোল করে হয়েছিলেন বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে কম বয়সী গোলদাতা। ২০২৬ সালে ২০ বছর পর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে গোল করে মেসি হয়েছেন বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতা। বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যাওয়া মেসিকে হাতছানি দিচ্ছে এক আসরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডও। ব্রাজিলের রোনালদো একটা সময় ১৫ গোল নিয়ে দখলে রেখেছিলেন বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড। তার রেকর্ড ভাঙেন মিরোস্লাভ ক্লোসা। একটা সময় মনে করা হচ্ছিল, ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড সহজে ভাঙবে না। কিন্তু এ আসরে মেসি ছাড়িয়ে গেছেন ক্লোসাকে, পিছু পিছু ছুটে আসছেন কিলিয়ান এমবাপ্পেও। তবে চল্লিশে পা রাখা মেসিকে এ আসরের প্রথম দুই ম্যাচেই পঁাচ গোল করে ফেলতে দেখে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো রীতিমতো বাকরুদ্ধ, ‘মেসির বয়স ৩৮! হা ঈশ্বর, এটা ভাবা যাচ্ছে না! আমার যখন ৩৮, তখন আমি চার বছর হয় ফুটবল ছেড়ে দিয়েছি আর ওজন হয়ে গিয়েছিল ১২০ কেজি! সে যে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে, তা প্রমাণ করতে এই একটা পরিসংখ্যানই যথেষ্ট।’ ফরাসি গণমাধ্যম লেকিপকে কথাটা বলেছেন ‘আর-নাইন’।
অধরা থেকে যাওয়া বিশ্বকাপ শিরোপাও মেসির হাতে উঠেছে বছর চারেক আগে লুসাইলের সেই মোহময় রাতে। শৈশবের তীর্থভূমি বার্সেলোনা ছেড়ে সেই সময় মেসি পাড়ি জমিয়েছেন ছবি আর কবিতার প্যারিসে। অনেকেই ভেবেছিলেন, বিশ্বকাপ দিয়েই বোধহয় আকাশি-নীলে সমাপ্তি হবে মেসি অধ্যায়ের। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে মেসি আর্জেন্টিনাকে নিয়ে পৌঁছে গেলেন ২০২৬ বিশ্বকাপেও। বাছাই পর্বে আর্জেন্টিনা সবার ওপরে, মেসি সর্বোচ্চ গোলদাতা।
বিশ্বকাপে এলেন, ততদিনে ইউরোপ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে থিতু হয়ে গেছেন। অনেকেই মনে করলেন, মেজর লিগ সকারের পিকনিক মুডের ফুটবল খেলা মেসি আগের ধার হারিয়েছেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে মেসি বুঝিয়ে দিলেন, গতিই সব নয়। ম্যাচের সময় মাঠের এ-মাথা ও-মাথা দৌড়ে শুধু শুধু শক্তি খরচ করেন না, তবে চিলের মতোই তীক্ষ্ণ নজর রাখেন বলে। হ্যাটট্রিকে শুরু, পরের ম্যাচে অস্ট্রিয়ার জালে জোড়া গোল। দুটি গোল আলাদা বৈশিষ্ট্যে অনন্য। প্রথমটি অনবদ্য দলীয় সমন্বয়ে। লাউতারো মার্তিনেসরা ব্যস্ত রেখেছেন অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগের ফুটবলারদের, তাদের পাহারা দিতেই ব্যস্ত সবাই। বাঁ প্রান্তে ফাকুন্দো মেদিনা বলটা যখন ছাড়লেন, তখন সামনে সামনে থিয়াগো আলমাদা। কিন্তু পাসটা না ধরে আলমাদা ডামি করে ছেড়ে দিলেন মেসির জন্য, অনেকটা অলক্ষ্যেই মেসি ততক্ষণে ওপরে উঠে এসেছেন এবং তারপর বাঁ পায়ের জাদুকরী কিক!
ম্যাচের অন্তিম সময়ে মেসি মাঠের ডানপ্রান্ত ধরে উঠছেন, লম্বা একটা ক্রস দিলেন হুলিয়ান আলভারেসকে। এ জায়গা থেকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফরোয়ার্ডই গোল করে দেবেন। চেষ্টাও করলেন, কিন্তু গোলকিপার আটকে দিলেন। মেসি যেন জানতেন যে গোলকিপার আলভারেসের শটটা ফেরাবেন, ফিরতি বলটা কোথায় আসবে, সেটিও যেন জানা! ঠিক সেখানে মেসি হাজির, ছয় গজ বক্সের ভেতর অল্প জায়গায় বলের ওপর দারুণ নিয়ন্ত্রণ রেখে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারের দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে বলটাকে গলিয়ে দিয়েছেন। অসাধারণ ড্রিবলের সঙ্গে দুর্দান্ত ভিশনের সমন্বয় না হলে এ ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয় এবং তা বিশ্বকাপে করে দেখিয়েছেন তিনি, যিনি বছর দুয়েক হয় ইউরোপের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার লিগের বাইরে স্বেচ্ছায় এসে খেলছেন মেজর লিগ সকারে।
বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড নিজের করে নেওয়ার পর মেসিকে ডাকছে জুস্ত ফোঁতেনের এক বিশ্বকাপে ১৩ গোলের রেকর্ড। ১৯৫৮ সালে ফরাসি ফরোয়ার্ড ফোঁতেন যে রেকর্ড করেছিলেন, প্রায় সাত দশক ধরে অক্ষত থাকা সেই রেকর্ডের মালিকানা এবার বদল হতে পারে। সেবার প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছিলেন ফোঁতেন, পরের ম্যাচে জোড়া গোল। এবার মেসিও তাই। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পরের ম্যাচটা প্রথমবার খেলতে আসা জর্ডানের বিপক্ষে, যারা দুই ম্যাচে এরই মধ্যে হজম করেছে পাঁচ গোল। ‘জে’ গ্রুপ থেকে আর্জেন্টিনার গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা প্রায় নিশ্চিত, শেষ ৩২-এর রাউন্ডে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হতে পারে আরেক নবাগত কেপ ভার্দে। নীল হাঙররা প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে এসেই কামড়ে দিয়েছে দুই সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়েকে, তাদের থেকে কেড়ে নিয়েছে ১টি করে পয়েন্ট। শেষ ম্যাচে সৌদি আরবকে হারাতে পারলে কেপ ভার্দেই হয়ে যেতে পারে গ্রুপ রানার্সআপ। তখন তারাই হবে শেষ ৩২-এর রাউন্ডে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ।
জন্মদিনে কী করছেন, ম্যাচ শেষে মেসির হাতে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটা তুলে দেওয়ার সময় জানতে চাওয়া হয়েছিল। মেসি বলেছেন, আসছে সপ্তাহ কাটাতে চান শান্তিতে, ‘জিততে পেরে খুব খুশি, সামনের সপ্তাহ শান্তিতে কাটবে। (জন্মদিন নিয়ে) এখন আমি খুব ক্লান্ত, কিছুই মাথায় আসছে না। আমি মুহূর্তটা উপভোগ করছি। আশা করি, আমার সতীর্থদের নিয়ে সামনে ভালো সময় কাটবে।’




