গাড়ি বিক্রেতা থেকে রাজপুত্র
- ২৬ বছর পর বাবার স্বীকৃতিতে বদলে গেল ক্লেমঁর জীবন

জীবনের ২৬ বছর কেটেছে সাধারণ মানুষের মতোই। কাজ করেছেন গাড়ি বিক্রেতা হিসেবে। রাজপ্রাসাদের ঝলকানি নয়, তার পরিচয় ছিল আর পাঁচজন তরুণের মতো। কিন্তু এক স্বীকৃতিতে বদলে গেল সব। বেলজিয়ামের রাজা ফিলিপের ছোট ভাই প্রিন্স লরঁ আনুষ্ঠানিক ভাবে নিজের ছেলে হিসেবে স্বীকার করেছেন ক্লেমঁ ভানডেনকের্কহোভেকে। আর সেই স্বীকৃতির পরই ২৬ বছরের ক্লেমঁ হয়ে গেলেন বেলজিয়ামের রাজপুত্র।
তবে এই রাজকীয় পরিচয় এসেছে কোনও প্রাসাদের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নয়। বরং একটি ছোট, ব্যক্তিগত নাগরিক অনুষ্ঠানে। প্রায় ছয় মাস আগে একটি টাউন হলে হওয়া সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে বাবা-ছেলের সম্পর্ক আইনিভাবে নথিভুক্ত হয়। সেই খবর প্রকাশ্যে এসেছে সম্প্রতি।
ক্লেমঁর জন্ম হয়েছিল ২০০০ সালে। তাঁর মা আইরিস ভানডেনকের্কহোভে, যিনি বেলজিয়ামে জনপ্রিয় গায়িকা ও মডেল হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং মঞ্চনাম ওয়েন্ডি ভ্যান ওয়ান্টেন নামে খ্যাত। ১৯৯০-এর দশকে আইরিসের সঙ্গে প্রিন্স লরঁর সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্ক থেকেই ক্লেমঁর জন্ম। বহু বছর ধরে তাঁর পিতৃপরিচয় নিয়ে জল্পনা থাকলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি রাজপরিবার।
শেষ পর্যন্ত ডিএনএ পরীক্ষাই মুছে দেয় সব প্রশ্ন। পরীক্ষায় প্রিন্স লরঁর সঙ্গে ক্লেমঁর জৈবিক সম্পর্কের ৯৯.৫ শতাংশ মিল পাওয়া যায় বলে জানা গেছে। এরপর ২০২৫ সালে প্রিন্স লরঁ প্রথম প্রকাশ্যে জানান, ক্লেমঁ তাঁর সন্তান। আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পর তিনি এখন রাজপরিবারের স্বীকৃত সদস্য।
শৈশবজুড়ে ছিল পরিচয়ের প্রশ্ন
রাজপরিবারের সন্তান হয়েও ক্লেমঁর শৈশব কেটেছে সাধারণ জীবনেই। ছোটবেলায় বারবার তার মনে প্রশ্ন জেগেছে, “আমার বাবা কে?” পরে যখন তিনি সত্য জানতে পারেন, তখন আরও কঠিন হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। কারণ নিজের পরিচয় জানলেও দীর্ঘদিন সেটি প্রকাশ করতে পারেননি তিনি।
এক সাক্ষাৎকারে ক্লেমঁ জানিয়েছেন, এই গোপনীয়তা তার মানসিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। উদ্বেগ ও মানসিক চাপের মধ্যেও তিনি নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন গাড়ি বিক্রির কাজ। সেই কাজ তিনি পছন্দও করতেন বলে জানিয়েছেন।
এখন বাবার স্বীকৃতি পাওয়ার পর তার সবচেয়ে বড় অনুভূতি অর্থ বা রাজকীয় মর্যাদা নয়। ক্লেমঁর কথায়, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমি এখন এমন একজন ছেলে, যে নিজের বাবাকে জানার সুযোগ পেয়েছে।”
রাজপুত্র, কিন্তু সিংহাসনের উত্তরাধিকারী নন
রাজপরিবারের সদস্য হলেও ক্লেমঁর নতুন পরিচয়ের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি রাজপুত্রের উপাধি ব্যবহার করতে পারবেন এবং বাবার ব্যক্তিগত সম্পত্তির উত্তরাধিকারের অংশীদার হবেন। কিন্তু তিনি রাজকীয় ভাতা পাবেন না, কোনও সরকারি রাজকীয় দায়িত্ব পালন করবেন না এবং বেলজিয়ামের সিংহাসনের উত্তরাধিকার তালিকাতেও থাকবেন না।
প্রিন্স লরঁর আরও তিন সন্তান রয়েছেন, প্রিন্সেস লুইস এবং যমজ প্রিন্স নিকোলাস ও প্রিন্স আয়মেরিক। ক্লেমঁ এখন তাদের সঙ্গেই বাবার ব্যক্তিগত সম্পত্তির উত্তরাধিকার ভাগাভাগির অধিকার পাবেন।
তবে নতুন পরিচয় পেলেও নিজের পুরনো পরিচয় পুরোপুরি ছাড়তে চান না ক্লেমঁ। বাবার রাজপরিবারের পদবি ভ্যান সাক্সেন-কোবুর্গ গ্রহণ করবেন কি না, তা নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নেননি তিনি। তাঁর বক্তব্য, মায়ের দেওয়া ভানডেনকের্কহোভে পদবি তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বেলজিয়াম রাজপরিবারে এমন ঘটনা নতুন নয়
বেলজিয়ামের রাজপরিবারেv বিয়ের বাইরে জন্ম নেওয়া সন্তানের স্বীকৃতি নিয়ে এর আগে আরও একটি বড় ঘটনা ঘটেছিল। সাবেক রাজা দ্বিতীয় আলবের্টের মেয়ে ডেলফিন বোলও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর রাজকীয় পরিচয় পেয়েছিলেন। ২০২০ সালে আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি বেলজিয়ামের রাজকুমারী হিসেবে স্বীকৃতি পান।
ক্লেমঁর ঘটনাও সেই ধারারই আর একটি অধ্যায়। তবে তাঁর ক্ষেত্রে আদালতের দীর্ঘ লড়াইয়ের বদলে এসেছে পারিবারিক স্বীকৃতি ও আইনি পিতৃত্ব নির্ধারণ।
এক সময় যার পরিচয় ছিল শুধু একজন গাড়ি বিক্রেতা হিসেবে, আজ তিনি ইউরোপের অন্যতম পুরনো রাজপরিবারের সদস্য। কিন্তু রাজমুকুটের ঝলকানির চেয়েও ক্লেমঁর কাছে বড় হয়ে উঠেছে অন্য কিছু, ২৬ বছর ধরে হারিয়ে থাকা বাবার পরিচয় ফিরে পাওয়া।






