ইউরোপের জেন জি কেন এত জেদি হয়ে উঠল

ফ্রান্সের নঁতে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম বাড়ার প্রতিবাদে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের ডাকা দেশব্যাপী বিক্ষোভে জ্বলন্ত ময়লার পাত্র নেভানোর চেষ্টা করছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
ইউরোপের তরুণরা কি সত্যিই বেশি জেদি হয়ে উঠেছে? নাকি তারা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে তাদের ধৈর্য ধরার সুযোগ কমে গেছে?
ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, গ্রিস, আলবেনিয়া ও সার্বিয়ায় সাম্প্রতিক বিক্ষোভের দিকে তাকালে এমন প্রশ্নই উঠছে। একেক দেশে একেক কারণে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। কোথাও শিক্ষা খাতে অর্থের অভাব। কোথাও বাড়িভাড়া বেশি আবার কোথাও সংকট আবাসনের। কোথাও অসন্তোষ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে, কোথাও ক্ষোভ দুর্নীতির বিরুদ্ধে। কিন্তু এসব আন্দোলনের মধ্যেও একটি মিল স্পষ্ট— তরুণরা মনে করছেন, তাদের ভবিষ্যৎ আগের প্রজন্মের মতো নিরাপদ নয়।
ফ্রান্সে শিক্ষা থেকে শুরু, ক্ষোভ ছড়াল সর্বত্র
ফ্রান্সে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল স্কুল ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। শিক্ষার্থীরা বলছিলেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের সংকট আছে। অনেক স্কুলের অবকাঠামোও দুর্বল। তারা ছোট শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকদের জন্য বেশি অর্থ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় স্কুল অবকাঠামোয় বিনিয়োগের দাবি জানায়।
কিন্তু বিক্ষোভ সেখানেই থেমে থাকেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন এবং পুলিশের আচরণ নিয়ে ক্ষোভ। কয়েক বছরের পুরনো ছাত্রবিক্ষোভের তুলনায় এবার আন্দোলন অনেক বড় হয়েছে।
ইতালিতেও একই চিত্র। শিক্ষার্থীরা দুর্বল স্কুল ভবন, শিক্ষা খাতে কম বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। গ্রিসে তরুণরা বিনামূল্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বই, আবাসন সহায়তা এবং ভাড়া নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলেছে। দেশটির সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক সংকটও বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে।
অর্থাৎ শিক্ষা এখানে শুধু পড়াশোনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে তরুণদের ভবিষ্যৎ।
আসল চাপ আবাসন ও জীবনযাত্রার খরচ
জেন জির ক্ষোভের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো আবাসন।
স্পেনে বাড়িভাড়া ও বাড়ির দাম বেড়ে যাওয়ায় তরুণরা রাস্তায় নেমেছেন। মাদ্রিদে তাঁবু খাটিয়ে আবাসন আন্দোলন চলছে। পর্তুগালেও একই সমস্যা। লিসবন ও পোর্তোয় তরুণরা তাঁবু খাটিয়ে সাশ্রয়ী আবাসনের দাবি জানাচ্ছেন।
পর্তুগালে ২০১৭ সালের পর বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। নতুন ভাড়ার দামও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে চাকরি থাকলেও অনেক তরুণের জন্য আলাদা বাসা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ জায়গাটিই জেন জির হতাশার মূল কারণ বুঝতে সাহায্য করে।
তাদের অনেকের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মানে ঋণ বা পরিবারের ওপর নির্ভরতা। চাকরি পাওয়া মানে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়। চাকরি পেলেও বাড়িভাড়া, খাবার, জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ সামলানো কঠিন।
ফলে তাদের প্রশ্নটা শুধু ‘আজ কী হচ্ছে’— তা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, ‘আগামী ১০ বা ২০ বছর পর আমরা কোথায় থাকব?’
বাবা-মায়ের মতো জীবন কি আর সম্ভব?
এ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় হতাশা সম্ভবত এখানেই।
ইউরোপের উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি বড় প্রতিশ্রুতি ছিল— প্রতিটি নতুন প্রজন্ম আগের প্রজন্মের চেয়ে ভালো জীবন পাবে। কিন্তু জেন জির একটি অংশ এখন মনে করছে, সেই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব নয়।
তাদের মা-বাবা হয়তো তুলনামূলক সহজে বাড়ি কিনেছেন। স্থায়ী চাকরি পেয়েছেন। পরিবার গড়েছেন। কিন্তু একই পথ এখনকার তরুণদের জন্য অনেক কঠিন।
শিক্ষা শেষ করেও অনেকে অনিশ্চিত চাকরির বাজারে ঢুকছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারও নতুনদের চাকরি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে যেসব কাজ দিয়ে তরুণরা কর্মজীবন শুরু করতেন, সেসব কাজের কিছু অংশ প্রযুক্তির মাধ্যমে বদলে যাচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা একাধিক দিক থেকে তৈরি হচ্ছে।
এক দেশের বিক্ষোভ আরেক দেশে ছড়িয়ে পড়ছে কেন
ইউরোপের এবারের আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— এক দেশের বিক্ষোভ অন্য দেশের তরুণদের প্রভাবিত করছে।
ইতালির শিক্ষার্থীরা ফ্রান্সের আন্দোলনের কথা বলছেন। গ্রিসের বিক্ষোভকারীরা স্লোগানে ফ্রান্সের কথা উল্লেখ করেছেন। স্পেনের আবাসন আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে পর্তুগালে। বিভিন্ন দেশের ছাত্র সংগঠন নিজেদের অভিজ্ঞতা ও কৌশল ভাগ করে নিচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই যোগাযোগ আরও সহজ করেছে। ফলে কোনো একটি দেশের আন্দোলন এখন আর শুধু সেই দেশের ঘটনা থাকে না। অন্য দেশের তরুণরা খুব দ্রুত তা দেখতে, বুঝতে এবং নিজেদের পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন।
এ কারণেই ফ্রান্সে শিক্ষকদের নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন ইতালির শিক্ষা ও আবাসন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। আবার স্পেনের আবাসন সংকট পর্তুগালের তরুণদেরও রাস্তায় নামাচ্ছে।
শুধু জেন জির আন্দোলন নয়
তবে ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভকে শুধু জেন জির বিদ্রোহ বললে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।
আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো সমস্যা সব বয়সের মানুষকেই আঘাত করছে। ফলে অনেক আন্দোলনে তরুণদের সঙ্গে শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, পরিবেশকর্মী এবং বয়স্ক মানুষও যোগ দিয়েছেন।
ইতালিতে জ্বালানির দাম নিয়ে ট্রাকচালকরাও আন্দোলনে নেমেছেন। স্পেন ও পর্তুগালে শ্রমিক সংগঠনগুলোও বিক্ষোভে যুক্ত হয়েছে। ফ্রান্সে ছাত্রদের সঙ্গে বড় শ্রমিক সংগঠন, কৃষক ও পরিবেশকর্মীরাও রাস্তায় নেমেছেন।
অর্থাৎ জেন জি হয়তো এ ক্ষোভকে সামনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু ক্ষোভটি শুধু তাদের নয়।
অর্থনৈতিক সংকটও বড় কারণ
ইউরোপের অনেক দেশের সরকারের হাতও এখন খুব বেশি খোলা নেই।
ফ্রান্স, ইতালি, গ্রিস, স্পেন ও পর্তুগালের মতো দেশগুলোকে উচ্চ সরকারি ঋণ এবং দুর্বল অর্থনীতির চাপ সামলাতে হচ্ছে। একই সময়ে জনগণ চাইছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তায় আরও বেশি সরকারি ব্যয়।
কিন্তু সরকার যদি এসব খাতে ব্যয় বাড়ায়, তাহলে বাজেটের ওপর চাপ বাড়ে। আবার ব্যয় কমালে তরুণদের ক্ষোভ বাড়ে।
এ দ্বন্দ্বই সরকারগুলোর জন্য বড় সমস্যা তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয়, বাড়িভাড়া, জ্বালানি ও জনসেবার চাপ নিয়ে বিক্ষোভ বাড়ার পেছনে এ অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে জেন জি এত ‘জেদি’ কেন
আসলে তাদের জেদকে শুধু জেদ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
তারা এমন একটি প্রজন্ম, যারা একই সঙ্গে কয়েকটি সংকট দেখেছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন— সবকিছু তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তাদের কাছে ধৈর্য ধরার অর্থ অনেক সময় আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করা। কিন্তু তারা মনে করছে, অপেক্ষা করলেই পরিস্থিতি বদলাবে— এমন নিশ্চয়তা নেই।
তাই তাদের দাবি শুধু ‘আরও টাকা দিন’ নয়। তারা চাইছে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষা শেষ করার পর কাজ থাকবে, কাজ করলে সম্মানজনক আয় থাকবে, আয় দিয়ে বাসা ভাড়া নেওয়া যাবে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করা যাবে।
এ কারণেই একটি স্কুলের শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু হওয়া ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত আবাসন, চাকরি, স্বাস্থ্য, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্নে গিয়ে ঠেকছে।
ইউরোপের জেন জির আসল বার্তা সম্ভবত এটাই— তারা আগের প্রজন্মের মতো একই প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা এখন তার বাস্তব ফল দেখতে চায়। আর সেই ফল না পেলে রাস্তায় নামতে তারা আর আগের মতো দ্বিধা করছে না।
সূত্র : সিএনএন









