ইসরায়েলের অবৈধ বসতিতে শুধু নিন্দা নয়, বাণিজ্য বন্ধের পথে ব্রিটেন
- বাধা হতে পারেন ট্রাম্প, বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা

নিন্দা আর কূটনৈতিক বিবৃতিতে থেমে না থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতিগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার পথে এগোচ্ছে ব্রিটেন। ইসরায়েলি বসতি থেকে আসা পণ্য কেনাবেচা বন্ধ করার পাশাপাশি সেখানে পরিষেবা দেওয়া এবং ব্রিটেন থেকে পণ্য রফতানিতেও নিষেধাজ্ঞা আনার প্রস্তুতি চলছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের এই পরিকল্পনায় সমর্থন জানিয়েছেন অর্ধেক ব্রিটিশ নাগরিক। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প৷ নিজের দলের এমপিদের একাংশই বার্নহ্যামকে সতর্ক করেছেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হতে পারে।
ব্রিটেনের এই পদক্ষেপের কেন্দ্রে অধিকৃত পশ্চিম তীরের ই-১ এলাকা। ইসরায়েল সরকার সেখানে নতুন করে ১,২০০টির বেশি বাড়ি নির্মাণের দরপত্র প্রকাশ করেছে। ই-১ পূর্ব জেরুজালেম ও প্রায় সাত কিলোমিটার দূরের বৃহৎ ইসরায়েলি বসতি মা'আলে আদুমিমের মাঝামাঝি এলাকায়। সেখানে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে একটি অবিচ্ছিন্ন ইসরায়েলি বসতি-করিডর তৈরি হবে। সমালোচকদের আশঙ্কা, তাতে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভৌগোলিক সংযোগ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং কার্যকর স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি বসতি আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ বলে মনে করে ব্রিটিশ সরকারসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বৃহৎ অংশ। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও ২০২৪ সালের পরামর্শমূলক মতামতে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের নীতি ও কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসঙ্গত বলে জানায় এবং অন্য রাষ্ট্রগুলোকে সেই বেআইনি পরিস্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা না করার বাধ্যবাধকতার কথা বলে। ইসরায়েল অবশ্য বসতিগুলোকে অবৈধ বলার অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড গত ১৯ আগস্ট ই-১ প্রকল্পের নতুন দরপত্রকে ‘অগ্রহণযোগ্য ও ধ্বংসাত্মক’ পদক্ষেপ হিসেবে নিন্দা করেন। প্রতিবাদ জানাতে ইসরায়েলের শীর্ষ কূটনীতিককেও তলব করা হয়। একই সঙ্গে মিলিব্যান্ড জানান, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইসরায়েল সরকারের নীতির জবাবে একটি ‘বিস্তৃত পদক্ষেপের প্যাকেজ’ ঘোষণা করবে লন্ডন। অবৈধ বসতি সম্প্রসারণে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও তার অংশ হতে পারে।
শুধু আমদানি নয়, রফতানি ও পরিষেবাও বন্ধ হতে পারে
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে শুধু অবৈধ বসতিতে উৎপাদিত পণ্য ব্রিটেনে ঢোকাই বন্ধ হবে না। ব্রিটেন থেকে ওই বসতিগুলোতে পণ্য পাঠানো এবং সেখানে বিভিন্ন পরিষেবা দেওয়াও নিষিদ্ধ হতে পারে। তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী স্যার ক্রিস ব্রায়ান্ট সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছিলেন, পণ্য ও পরিষেবা দুই ক্ষেত্রই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সেপ্টেম্বরেই নীতি ঘোষণা হতে পারে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের খবর।
তবে বাস্তবায়ন সহজ নয়। অধিকৃত ফিলিস্তিনি এলাকা, ইসরায়েলি বসতি এবং ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে পণ্যের চলাচল ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ফলে কোনও পণ্য ঠিক কোথায় উৎপাদিত হয়েছে, তা শুল্ক কর্মকর্তাদের পক্ষে নির্ধারণ করা কঠিন হতে পারে। ব্রিটিশ সরকার এর আগে গোটা ইসরায়েলের সঙ্গে ২০১৯ সালের বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত করার কথাও বিবেচনা করেছিল, তবে শেষ পর্যন্ত সেই পথে যায়নি।
অর্ধেক ব্রিটিশ বলছেন–বাণিজ্য বন্ধ হোক
বার্নহ্যামের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠেছে জনমত। ২৬ আগস্ট ব্রিটিশ সরকারি ওয়েবসাইট ইউগভের ৬,১৪২ জনের উপর চালানো সমীক্ষায় ৫০ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ইসরায়েলের অবৈধ পশ্চিম তীরের বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। বিরোধিতা করেছেন মাত্র ১৬ শতাংশ; সিদ্ধান্তহীন ৩৪ শতাংশ।
সমর্থন শুধু লেবার বা বামঘেঁষা ভোটারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। লেবার, লিবারেল ডেমোক্র্যাট ও গ্রিন ভোটারদের মধ্যে সমর্থন সবচেয়ে বেশি হলেও কনজারভেটিভ এবং রিফর্ম ইউকের ভোটারদের মধ্যেও নিষেধাজ্ঞার প্রতি উল্লেখযোগ্য সমর্থন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ইসরায়েলের অবৈধ বসতি প্রশ্নে ব্রিটিশ জনমতের অবস্থান দলীয় রাজনীতির সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
বার্নহ্যামের নিজের দলেও চাপ প্রবল। ১৪০ জনের বেশি লেবার এমপি বসতিগুলির সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। লেবার এমপি রিচার্ড বার্গন বলেছেন, ইসরায়েলের অবৈধ বসতির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বেআইনি দখলদারিত্বের অবসানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ হবে। রদারহ্যামের লেবার এমপি সারা চ্যাম্পিয়নও বলেছেন, পশ্চিম তীরের দখল আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং ব্রিটেনের কোনওভাবেই সেটিকে সহায়তা করা উচিত নয়।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সারা সানবার-এর বক্তব্য আরও সরাসরি, শুধু নিন্দা করলে হবে না; আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বাস্তব পরিণতি আছে, সেটি দেখাতে হবে। তাঁর মতে, অবৈধ বসতির সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অর্থ উপার্জনের সুযোগও কমবে।
বাধা ট্রাম্প, বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা
কিন্তু এখানেই সামনে এসেছে ওয়াশিংটন। বার্নহ্যামকে তাঁর দলের কয়েক জন এমপি সতর্ক করেছেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টা শুল্ক আরোপ করতে পারেন। মার্কিন আইনে ইসরায়েলবিরোধী কিছু বয়কটের বিরুদ্ধে বিধান রয়েছে এবং ট্রাম্প প্রশাসন এর আগেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়া ইউরোপীয় দেশগুলির তীব্র সমালোচনা করেছে।
বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর কারণ আগামী সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় ট্রাম্পের সঙ্গে বার্নহ্যামের প্রথম মুখোমুখি বৈঠক হওয়ার কথা। ইউক্রেনের জন্য আরও আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র নিশ্চিত করতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সহযোগিতা চাইবেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। তার আগেই ইসরায়েল প্রশ্নে দুই দেশের বিরোধ নতুন কূটনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
ইসরায়েলপন্থী লেবার ফ্রেন্ডস অব ইসরায়েল-ও প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছে। সংগঠনটির আশঙ্কা, ইসরায়েলের অর্থনীতি ও বসতি এলাকার ব্যবসা এতটাই পরস্পর সংযুক্ত যে নিষেধাজ্ঞা শেষ পর্যন্ত কার্যত গোটা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বয়কটে পরিণত হতে পারে এবং ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি দুই পক্ষের কর্মীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তবে মানবাধিকারকর্মীদের পাল্টা যুক্তি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অধিকৃত ভূখণ্ড ছেড়ে চলে এলে তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণই থাকবে না।
ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণ অবশ্য থামেনি। গত বছরই দেশটি অবৈধ বসতি সম্প্রসারণে ৮০ কোটি ডলারের বেশি বরাদ্দ করেছিল। ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ নিজেও একজন অবৈধ বসতি স্থাপনকারী এবং এর আগে বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছিলেন।
ফলে বার্নহ্যামের সামনে এখন কঠিন পরীক্ষা। এক দিকে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রতিশোধ এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক; অন্য দিকে নিজের দলের ১৪০-র বেশি এমপি, ব্রিটিশ জনমতের অর্ধেক এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন।
ব্রিটেন শেষ পর্যন্ত কত দূর যাবে, তা এখনও ঘোষণা হয়নি। কিন্তু ই-১-এ নতুন ইসরায়েলি বসতি নির্মাণের পর লন্ডনের বার্তায় পরিবর্তন স্পষ্ট, অবৈধ বসতি নিয়ে শুধু ‘নিন্দা’ নয়, এবার তার অর্থনৈতিক মূল্যও ইসরায়েলকে দিতে হতে পারে।







