ব্রিটেনের পরমাণু অস্ত্রে অর্থ ঢালতে চায় জার্মানি

রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসন নিয়ে ইউরোপে উদ্বেগ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে, সেই প্রশ্নের মধ্যেই নতুন এই সমীকরণ।
নিজের পরমাণু বোমা বানানোর পথে নয়, বরং ব্রিটেনের পরমাণু শক্তিকেই আরও শক্তিশালী করতে অর্থ ঢালার কথা ভাবছে জার্মানি। রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসন নিয়ে ইউরোপে উদ্বেগ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে, সেই প্রশ্নের মধ্যেই নতুন এই সমীকরণ। বুধবার প্রকাশ্যে আসা তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটেনের ট্রাইডেন্ট পরমাণু প্রতিরোধব্যবস্থায় আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে বার্লিনে। বৃহস্পতিবার সেই পরিকল্পনার সামরিক তাৎপর্য নিয়ে নতুন বিশ্লেষণও সামনে এসেছে।
জার্মান সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। তবে আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক জার্মান সূত্রের বক্তব্য, ইউরোপের বর্তমান পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো যাতে নিজেদের সক্ষমতা আরও বাড়াতে পারে, তাতে বার্লিনের প্রবল আগ্রহ রয়েছে। আর এক কূটনৈতিক সূত্রের কথায়, ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের এখন প্রায় প্রতিদিনই ভাবতে হচ্ছে পরের দিন আমেরিকা কী সিদ্ধান্ত নেবে।
কীভাবে সাহায্য করতে পারে জার্মানি
আলোচনায় একাধিক সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রিটেনের পরবর্তী প্রজন্মের পরমাণু অস্ত্রবাহী সাবমেরিন, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিংবা ভবিষ্যৎ পরমাণু ওয়ারহেডের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে জার্মান অর্থ বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান যুক্ত হতে পারে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মহলের একাংশের প্রশ্ন, অত্যন্ত বিশেষায়িত ব্রিটিশ পরমাণু সাবমেরিন কর্মসূচিতে সরাসরি কাজ করার প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা জার্মান শিল্পের রয়েছে কি না।
তুলনায় বাস্তবসম্মত আর একটি প্রস্তাব হলো ব্রিটেনের গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তায় জার্মান সামরিক সহায়তা। স্কটল্যান্ডের ফাসলেন নৌঘাঁটি, যেখানে ব্রিটেনের পরমাণু অস্ত্রবাহী সাবমেরিন বহর অবস্থান করে, সেখানে জার্মান সেনাবাহিনী পরিচালিত প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।
ব্রিটেনের হাতে কী আছে
১৯৯৮ সাল থেকে ট্রাইডেন্টই ব্রিটেনের একমাত্র নিজস্ব পরমাণু অস্ত্রব্যবস্থা। বর্তমানে ভ্যানগার্ড শ্রেণির চারটি সাবমেরিন এই দায়িত্ব পালন করছে। আগামী দশকের গোড়া থেকে এগুলোর জায়গা নেবে নতুন ড্রেডনট শ্রেণির চারটি সাবমেরিন। ব্রিটিশ সরকার গত ৩০ জুলাই এই কর্মসূচির পরবর্তী নির্মাণপর্বে ৮৪০ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
ব্রিটেনের পরমাণু প্রতিরোধব্যবস্থা ন্যাটোর প্রতিরক্ষার জন্যও বরাদ্দ। তবে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর হাতেই থাকবে। জার্মানি অর্থ দিলেও ট্রাইডেন্টের ‘চাবি’ বার্লিনের হাতে যাবে না।
নিজের বোমা কেন নয়?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস এবং দেশে শক্তিশালী পরমাণুবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে জার্মানি বরাবরই নিজস্ব পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথ থেকে দূরে থেকেছে। পরমাণু অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তির অধীনেও দেশটি একটি অপারমাণবিক রাষ্ট্র।
তবে জার্মানি এরই মধ্যে ন্যাটোর ‘নিউক্লিয়ার শেয়ারিং’ ব্যবস্থায় যুক্ত। ফলে নিজের অস্ত্র তৈরি না করেও ইউরোপের পরমাণু প্রতিরোধে তার ভূমিকা রয়েছে। নতুন আলোচনার লক্ষ্য সেই ভূমিকা আরও গভীর করা।
ফ্রান্সের সঙ্গেও এগিয়েছে বার্লিন
শুধু ব্রিটেন নয়, ফ্রান্সের সঙ্গেও পরমাণু প্রতিরোধ নিয়ে সম্পর্ক গভীর করছে জার্মানি। চলতি বছরের ২ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস একটি উচ্চপর্যায়ের ‘পরমাণু পরিচালনা গোষ্ঠী’ তৈরির ঘোষণা দেন। চলতি বছরই ফরাসি পরমাণু মহড়ায় জার্মানির প্রচলিত সামরিক বাহিনী অংশ নেবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বার্লিনের এই তৎপরতার পেছনে বড় কারণ রাশিয়া। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মস্কোর পরমাণু হুমকির আবহে ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা নিয়ে নতুন করে হিসাব কষছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্পের আমেরিকা। ইউরোপের প্রতিরক্ষার বোঝা ইউরোপীয় দেশগুলোকেই আরও বেশি বহন করতে হবে–ওয়াশিংটনের এমন চাপ এবং ভবিষ্যতে ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমার আশঙ্কা জার্মানির উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ফলে প্রশ্নটা আর শুধু ব্রিটেনের ট্রাইডেন্টের খরচ কে দেবে, তা নয়। বড় প্রশ্ন, আমেরিকার পরমাণু ছাতার উপর ভরসা কমলে ইউরোপ নিজেকে কীভাবে রক্ষা করবে?
বার্লিন আপাতত নিজের পরমাণু বোমার পথে হাঁটছে না। কিন্তু ব্রিটেনের ট্রাইডেন্টে অর্থ, ফ্রান্সের সঙ্গে পরমাণু মহড়া এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ ঘাঁটিতে জার্মান প্যাট্রিয়ট বসানোর আলোচনা–সব মিলিয়ে ইঙ্গিত স্পষ্ট। রাশিয়ার হুমকি আর আমেরিকাকে ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যে ইউরোপ নিজের পরমাণু ঢাল নতুন করে সাজানোর হিসাব শুরু করেছে।







