ইউরোপে আরব বসন্তের হাওয়া

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, স্কুলের দুরবস্থা এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্স জুড়ে আবারও শুরু হয়েছে বিক্ষোভ। প্যারিসে আন্দোলন চলাকালে বিক্ষোভকারীদের ওপর জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ -রয়টার্স
‘আমরা সবাই নর্দমায় পড়ে আছি, কিন্তু আমাদের কেউ কেউ তাকিয়ে আছে তারার দিকে।’ ১৮৯২ সালে ‘লেডি উইন্ডারমিয়ার্স ফ্যান’ নাটকে এমনই এক শব্দবন্ধ লিখেছিলেন আইরিশ সাহিত্যিক অস্কার ওয়াইল্ড। প্রায় দেড় শতাব্দী পর সেই কথাই যেন নতুন অর্থ নিয়ে ফিরেছে ইউরোপের রাজপথে। যে মহাদেশ একদিন পৃথিবীকে সমৃদ্ধির পথ দেখিয়েছিল, সেখানেই আজ ঘর, কাজ আর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা খুঁজছেন তরুণরা। প্যারিসে কাঁদানে গ্যাস। বার্সেলোনায় আগুন। লিসবনে ভেঙে দেওয়া হচ্ছে প্রতিবাদীদের তাঁবু। রোমে সেনাপাহারা। ইউরোপ জুড়ে যেন নতুন এক বসন্তের পদধ্বনি। কিন্তু এই বসন্ত কি পরিবর্তনের, নাকি দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশা আর ক্ষোভের?
স্থানীয় সময় গত শনিবার ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল থেকে আলবেনিয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও দ্রব্যমূল্য ও মজুরি, কোথাও শিক্ষা, বাসস্থান, পেনশন কিংবা দুর্নীতি নিয়ে ক্ষোভ। রবিবার রয়টার্স, এএফপিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আন্দোলনগুলোর দাবি ও নেতৃত্ব এক নয়। তবে তরুণদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ বহু প্রতিবাদের অভিন্ন সুর। সবচেয়ে বড় সমাবেশ হয়েছে ফ্রান্সে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সেখানে ২৮৯টি কর্মসূচিতে অংশ নেন ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ; প্যারিসেই ১ লাখ ১০ হাজার। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, মোট বিক্ষোভকারী প্রায় ৮ লাখ। সহিংসতা ঠেকাতে মোতায়েন ছিল ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী। গতকাল সকালের হিসাবে আটক ১ হাজার ৩১৪ জন, আহত হয়েছেন ৫৩ পুলিশ সদস্য। লুট হয়েছে ২৪টি দোকান; অগ্নিকাণ্ডে জরুরি কর্মীদের হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে ৭৫ বার।
প্যারিস, মার্সেই, লিয়ঁসহ কয়েকটি শহরে বেশিরভাগ মিছিলের শেষদিকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। সেপ্টেম্বরে বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিবাদ পরে জীবনযাত্রার ব্যয়, মজুরি ও সরকারি পরিষেবা রক্ষার আন্দোলনে বিস্তৃত হয়। যোগ দেন শ্রমিক সংগঠনগুলোর কর্মীরাও। আগামী ৫ নভেম্বর আবার বড় কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
স্পেনের বার্সেলোনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো আহ্বানে গত শনিবার জড়ো হন শত শত তরুণ। পরে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে অশান্ত হয় নগরকেন্দ্র। গতকাল স্পেনের বার্তা সংস্থা এফের হিসাবে গ্রেপ্তার ১২৮ জন; তাদের ৭২ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। আহত ১৫ পুলিশ সদস্যের চারজন গুরুতর। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৩টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান; ৩৩টি অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়েছেন দমকলকর্মীরা। একই দেশে মাদ্রিদে পেনশন ব্যবস্থা সুরক্ষার দাবিতে শান্তিপূর্ণ মিছিল হয়েছে।
ইতালিতে মিলানের রাস্তায় নামানো হয় অতিরিক্ত ৫০০ সেনা। সেখানে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও রোম, তুরিন ও বোলোনিয়ায় উত্তেজনা দেখা দেয়। দেশ জুড়ে গ্রেপ্তার ৯ জন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয় আরও ৩৭১ জনকে; তাদের ১১০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। প্রতিবাদের বিষয় মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি সেবা ও যুদ্ধবিরোধিতা।
পর্তুগালে ক্ষোভের কেন্দ্রে বাসস্থান। লিসবনের রসিও চত্বরে শনিবারের মিছিল শেষে শতাধিক তাঁবু বসিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। রবিবার রাত ২টার পর শিবির সরিয়ে দেয় পুলিশ। লিসবনে ২৫ এবং পোর্তোয় ছয়জন গ্রেপ্তার হন। পুলিশের দাবি, দুই শহরে সাতজন সামান্য আহত; আয়োজকদের অভিযোগ, আহত আরও অনেক। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, প্রায় তিন লাখ বাসস্থানের ঘাটতি। বাড়ি ভাড়া ও উচ্ছেদ সংক্রান্ত নীতির পরিবর্তনও চাইছেন বিক্ষোভকারীরা।
২০১৭ সালের পর দেশটিতে বাড়ির দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে; নতুন চুক্তিতে ভাড়াও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আন্দোলনকারীরা এমন প্রস্তাবের বিরোধিতা করছেন, যাতে বাড়ি থেকে ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ সহজ হবে এবং নতুন ভাড়াচুক্তির সীমা উঠে যাবে। এই সংকট তরুণদের স্বাধীন জীবন শুরু করার পথও কঠিন করে তুলেছে। সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক নয়, গভীরভাবে প্রজন্মগতও বটে।
বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে ৯ জনকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়। আলবেনিয়ার তিরানায় সরকারি ভবনে হামলা ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় ২৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। মধ্য অক্টোবর থেকে সেখানে আহত পুলিশ ও বিক্ষোভকারীর সংখ্যা তিন শতাধিক।
দৃশ্যগুলো ফিরিয়ে আনছে ২০১০ সালের আরব বসন্তের স্মৃতি। তিউনিসিয়া থেকে মিসরে ছড়িয়ে পড়া সেই গণজাগরণের পেছনেও ছিল বেকারত্ব, দুর্নীতি ও তরুণদের হতাশা। তবে ইউরোপের বর্তমান আন্দোলনগুলোর রাজনৈতিক লক্ষ্য ভিন্ন। এখানে অনেকেই বিদ্যমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই সংস্কার চাইছেন।
আলবেনিয়ার এক তরুণী চিকিৎসা শিক্ষার্থী বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ‘আমরা নিজেদের দেশেই থাকতে চাই। অন্য কোথাও জীবনের স্বপ্ন দেখতে চাই না।’



