ব্রেক্সিটর পর ব্রিটেনের পণ্য রপ্তানি কমেছে ২০.৭ শতাংশ

২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে ব্রিটেনের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ২০.৭ শতাংশ কমেছে
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে বেরিয়ে গেলে খুলে যাবে গোটা বিশ্বের বাজার, ব্রেক্সিটের আগে এমনই স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বরিস জনসন, নাইজেল ফারাজ-সহ বিচ্ছেদের পক্ষের নেতারা। দশ বছর পর নতুন হিসাব বলছে উল্টো কথা। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে ব্রিটেনের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ২০.৭ শতাংশ কমেছে। আর ২০১৯ সালের সঙ্গে তুলনা করলে হারানো রপ্তানি আয়ের মূল্য বছরে প্রায় ১১.৭ বিলিয়ন পাউন্ড, ব্রিটেনের প্রতিটি পরিবারের হিসাবে প্রায় ৪০০ পাউন্ড। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) প্রকাশিত নতুন বিশ্লেষণ ঘিরে তাই আবার জোরালো হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক বাজারে ফেরার দাবি।
ব্রিটেনের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য সংগঠন লজিস্টিকস ইউকে নতুন এই হিসাব প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি মূলত পরিবহণ, মালবাহী ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতিনিধিত্ব করে। তাদের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০১৬ সালের পর ব্রিটিশ পণ্যের রপ্তানি শুধু ইউরোপেই কমেনি, ইউরোপের বাইরের বাজারে পতন হয়েছে আরও বেশি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্রিটেনের রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ১৫.৯ শতাংশ। অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশে কমেছে ৩৭.২ শতাংশ। অর্থাৎ ইইউ থেকে বেরিয়ে নতুন বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানির যে উল্লম্ফনের প্রতিশ্রুতি ব্রেক্সিটপন্থীরা দিয়েছিলেন, নতুন পরিসংখ্যানে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
লজিস্টিকস ইউকের বাণিজ্যবিষয়ক প্রধান জেমস মিলস, যিনি আগে লেবার পার্টির অর্থনৈতিক দলের উপদেষ্টা ছিলেন, সতর্ক করেছেন, বাণিজ্য বাড়ানোর সঙ্গে উৎপাদনশীলতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বড় বাজারে প্রবেশাধিকার ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়ায় এবং সফল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বড় হওয়ার সুযোগ দেয়। কিন্তু তাঁর মতে, ব্রিটেনের সাম্প্রতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি যাচ্ছে ঠিক উল্টো দিকে।
ব্যবসায়ীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বলছেন, ব্রেক্সিটে ক্ষতি
আরও চাপ বাড়িয়েছে ইউরোপিয়ান মুভমেন্ট ইউকে-র নতুন ব্যবসায়িক সমীক্ষা। এতে ৭২.৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ব্রেক্সিট তাদের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আরও ৯৬.৪ শতাংশ বলেছে, তাদের স্থানীয় এলাকার উপর ব্রেক্সিটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য, সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯৮.২ শতাংশ ব্যবসা ব্রিটেনকে আবার ইইউর একক বাজারে ফেরানোর পক্ষে মত দিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে সীমান্তে বাড়তি কাগজপত্র, শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা, পণ্যের উৎস প্রমাণের নিয়ম এবং ব্রিটেন ও ইইউর বিধিবিধানের ক্রমবর্ধমান পার্থক্য। ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন ইইউর একক বাজার ও শুল্ক ইউনিয়ন দুটিরই বাইরে চলে যাওয়ায় আগের মতো নির্বিঘ্নে পণ্য পাঠানোর সুযোগ আর নেই। বর্তমান বাণিজ্য চুক্তিতে অধিকাংশ পণ্যে শুল্ক ও কোটা না থাকলেও সীমান্ত পরীক্ষা এবং ‘রুলস অব অরিজিন’-এর মতো শর্ত ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন বাধা তৈরি করেছে।
শুধু নতুন হিসাব নয়, অন্য গবেষণাতেও একই ছবি
লজিস্টিকস ইউকের হিসাবই একমাত্র সতর্কসংকেত নয়। চলতি বছরের জুনে সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান রিফর্মের গবেষণায় দেখা যায়, একক বাজার ও শুল্ক ইউনিয়ন ছাড়ার কারণে ইইউতে ব্রিটেনের মোট রপ্তানি সম্ভাব্য মাত্রার তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ কম। পণ্যের ক্ষেত্রে ক্ষতি প্রায় ১৬ শতাংশ, আর পরিষেবায় প্রায় ৭ শতাংশ। বিশ্বজুড়ে ব্রিটেনের সামগ্রিক রপ্তানিও প্রায় ৫ শতাংশ কম হয়েছে বলে তাদের মডেলের হিসাব।
ব্রিটিশ সরকারের স্বাধীন আর্থিক পর্যবেক্ষক সংস্থা অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটি (ওবিআর)-র দীর্ঘমেয়াদি হিসাব আরও বিস্তৃত। তাদের ধারণা, ইইউতে থেকে গেলে ব্রিটিশ অর্থনীতি যে অবস্থানে থাকতে পারত, ব্রেক্সিটের কারণে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা তার তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ কম হবে, আর বাণিজ্যের তীব্রতা প্রায় ১৫ শতাংশ কমবে।
‘বছরে ১০০ বিলিয়ন পাউন্ড হারাচ্ছে ব্রিটেন’
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার জন মেজর জুনেই ব্রেক্সিটের অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর দাবি, ব্রেক্সিটের কারণে ব্রিটেন বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন পাউন্ডের বাণিজ্য এবং ৪০ বিলিয়ন পাউন্ডের কর রাজস্ব হারাচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ব্রিটেনকে ইইউর একক বাজারে ফিরে যাওয়ার লক্ষ্য নেওয়া উচিত বলেও মত দেন তিনি।
তবে এখানে ১০০ বিলিয়ন ও ১১.৭ বিলিয়ন পাউন্ডের হিসাব এক নয়। লজিস্টিকস ইউকের ১১.৭ বিলিয়ন পাউন্ড শুধু হারানো পণ্য রপ্তানি আয়ের একটি নির্দিষ্ট হিসাব; মেজরের উল্লেখ করা ১০০ বিলিয়ন পাউন্ড বৃহত্তর বাণিজ্য ক্ষতির অনুমান।
কিন্তু ‘লাল রেখা’ সরাচ্ছেন না বার্নহ্যাম
নতুন পরিসংখ্যান প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের উপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি ব্রিটেনকে একদিন আবার ইইউতে দেখতে চান বলে জানিয়েছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পূর্বসূরি কিয়ার স্টারমারের চেয়ে আরও ‘সাহসী’ হওয়ার কথাও বলেছেন। কিন্তু চলতি সপ্তাহেই ডাউনিং স্ট্রিট স্পষ্ট করেছে, ব্রেক্সিট নিয়ে আগের সরকারের তিনটি ‘লাল রেখা’ এখনও বহাল।
সরকারের বক্তব্য, ব্রিটেন ইইউতে ফিরবে না, একক বাজারে ফিরবে না, শুল্ক ইউনিয়নেও ফিরবে না এবং মানুষের অবাধ চলাচলও ফিরবে না। তবে খাদ্য ও পানীয় বাণিজ্য, বিদ্যুৎ এবং কার্বন নিঃসরণ বাণিজ্যের মতো ক্ষেত্রে ইইউর সঙ্গে চুক্তি করে বাধা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে চায় সরকার।
এই অবস্থানেই অসন্তুষ্ট লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা। দলের ইউরোপবিষয়ক মুখপাত্র অ্যাল পিঙ্কারটন অভিযোগ করেছেন, বার্নহ্যাম সাহসী হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রথম বাধাতেই পিছিয়ে গেছেন। তাঁদের দাবি, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ব্রিটেনকে একক বাজার ও শুল্ক ইউনিয়নের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে হবে।
তবে একক বাজার বা শুল্ক ইউনিয়নে ফেরারও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। শুল্ক ইউনিয়নে ফিরলে পণ্য বাণিজ্যের কিছু বাধা কমলেও ব্রিটেনের স্বাধীনভাবে অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করার ক্ষমতা সীমিত হবে। আর নরওয়ের মতো একক বাজারে গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার মডেল বেছে নিলে ইইউর কিছু নিয়ম মানা, আর্থিক অবদান এবং মানুষের চলাচলের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
২০১৬ সালের ২৩ জুন গণভোটে ৫১.৯ শতাংশ ব্রিটিশ ভোটার ইইউ ছাড়ার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। ব্রিটেন আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ছাড়ে ৩১ জানুয়ারি ২০২০, আর একক বাজার ও শুল্ক ইউনিয়ন থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যায় ২০২০ সালের শেষ দিনে।
দশ বছর আগে ব্রেক্সিটের অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি ছিল ইউরোপের গণ্ডি ছেড়ে ব্রিটেন হয়ে উঠবে আরও বড় বৈশ্বিক বাণিজ্যশক্তি। এক দশক পর পণ্য রপ্তানি ২০.৭ শতাংশ কমার হিসাব সেই প্রতিশ্রুতিকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এখন বার্নহ্যাম সরকারের সামনে প্রশ্ন, একক বাজারে না ফিরেও ইউরোপের সঙ্গে তৈরি হওয়া বাণিজ্যপ্রাচীর কতটা ভাঙতে পারবে ব্রিটেন?







