বাড়ছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও ইউরোপীয় সমর্থন
সাইপ্রাসের বিদ্যুৎ খাত বাস্তবায়নের পথে গ্রেট সি ইন্টারকানেক্টর

সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ইউরোপের বৃহত্তর বিদ্যুৎ বাজারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথে এগোচ্ছে সাইপ্রাস। গ্রেট সি ইন্টারকানেক্টর (GSI) প্রকল্পে ফরাসি অবকাঠামো বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান Meridiam-এর ৬৬ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা গ্রহণের সিদ্ধান্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়ন সম্ভাবনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি এখন প্রস্তাবের পর যেকোনো সময়ের তুলনায় বাস্তবায়নের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, GSI কেবল একটি বিদ্যুৎ সংযোগ প্রকল্প নয়; এটি সাইপ্রাসের বিদ্যুৎ বাজার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ইউরোপের সঙ্গে দেশটির কৌশলগত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে।
GSI বাস্তবায়িত হলে সাইপ্রাসের বিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বাজার সরাসরি ইউরোপের বৃহত্তর বিদ্যুৎ বাজারের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর ফলে বিদেশ থেকে তুলনামূলক কম দামে বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দেশীয় বিদ্যুৎ উৎপাদকদেরও প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে।
বর্তমানে সাইপ্রাসের বিদ্যুৎ বাজার ছোট এবং দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত। GSI চালু হলে ইউরোপের বিভিন্ন বাজারের সঙ্গে বিদ্যুৎ আদান-প্রদান সম্ভব হবে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিযোগিতাই দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুতের পাইকারি দামে নিম্নমুখী চাপ তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ, GSI-এর সুবিধা শুধু সস্তা বিদ্যুৎ আমদানিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দেশীয় উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায়ও দক্ষতা আনতে পারে।
প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধি। প্রতিবেশী ইউরোপীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ থাকায় জরুরি সময়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ থাকবে। ফলে রিজার্ভ ও স্ট্যান্ডবাই উৎপাদন সক্ষমতার প্রয়োজন কমতে পারে।
একই সঙ্গে অতিরিক্ত সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে তা নষ্ট বা উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে অন্য বাজারে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
এই অপারেশনাল সুবিধাগুলোর মাধ্যমে ভোক্তাদের জন্য প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় ১ থেকে ২ ইউরোসেন্ট পর্যন্ত অতিরিক্ত সাশ্রয় হতে পারে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
GSI বাস্তবায়নের ফলে সাইপ্রাসের সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় ধরনের ত্রুটি, আকস্মিক সরবরাহ সংকট কিংবা অতিরিক্ত চাহিদার সময় ইউরোপের পার্শ্ববর্তী বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সহায়তা নেওয়া যাবে।
এতে শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়বে না, বরং সাইপ্রাসের জ্বালানি নিরাপত্তাও শক্তিশালী হবে।
আগামী দিনে বৈদ্যুতিক গাড়ি, শিল্পকারখানা, বৈদ্যুতিক হিটিং এবং পানি বিশুদ্ধকরণে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সংযোগের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
GSI প্রকল্পে Meridiam-এর ৬৬ শতাংশ মালিকানা গ্রহণকে প্রকল্পটির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাম্প্রতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বেসরকারি অবকাঠামো বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও বিনিয়োগের রিটার্ন সম্পর্কে আস্থা না পেলে বড় ধরনের মূলধন বিনিয়োগ করে না। ফলে Meridiam-এর সিদ্ধান্তকে GSI-এর বাণিজ্যিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এখন সবার নজর European Investment Bank (EIB)-এর মূল্যায়নের দিকে। প্রস্তাবিত প্রায় ১ বিলিয়ন ইউরো EIB অর্থায়ন অনুমোদিত হলে প্রকল্পটির আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
Meridiam-এর অংশগ্রহণের ফলে GSI প্রকল্পে অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণের সম্ভাবনাও বেড়েছে। TAQA, Masdar, US DFC এবং সম্ভাব্যভাবে ইসরায়েলি অংশীদারদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে এসেছে।
EIB-এর অর্থায়ন অনুমোদিত হলে প্রকল্পটির আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ফলে GSI শুধু সাইপ্রাস-গ্রিসের মধ্যে একটি বিদ্যুৎ সংযোগ নয়, বরং ধীরে ধীরে একটি বহুজাতিক ইউরোপীয় কৌশলগত অবকাঠামো প্রকল্পে পরিণত হচ্ছে।
GSI প্রকল্পকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষ করে নির্মাণকাজে তুরস্কের সম্ভাব্য আপত্তি বা বাধা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
তবে প্রকল্পটির আন্তর্জাতিক সমর্থনও ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশন ইতোমধ্যে GSI-কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে সমর্থন দিয়েছে। গ্রিসও প্রকল্পটির বাস্তবায়ন আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অবস্থান জানিয়েছে।
এর পাশাপাশি ফরাসি প্রতিষ্ঠান Meridiam-এর বিনিয়োগ এবং কেবল নির্মাণে ফরাসি কোম্পানি Nexans-এর সম্পৃক্ততা প্রকল্পটির সঙ্গে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থকে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি সরাসরি কোনো নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নয়। তবে প্রকল্পে ইউরোপীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীদার যত বাড়বে, সম্ভাব্য বাধা সৃষ্টির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক মূল্যও তত বাড়বে।
GSI শেষ পর্যন্ত শুধু একটি বিদ্যুৎ কেবল হিসেবে বিবেচিত হলে এর প্রকৃত গুরুত্ব আড়ালে থেকে যাবে। প্রকল্পটি সাইপ্রাসের বিদ্যুৎ বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে, বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
Meridiam-এর বিনিয়োগের পর প্রকল্পটি নতুন গতি পেয়েছে। এর সঙ্গে যদি EIB-এর প্রস্তাবিত ১ বিলিয়ন ইউরো অর্থায়ন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের বিনিয়োগ যুক্ত হয়, তাহলে GSI বাস্তবায়নের সম্ভাবনা আরও দৃঢ় হবে।
সাইপ্রাসের জন্য তাই GSI শুধু একটি বিদ্যুৎ সংযোগ নয়—এটি হতে পারে সস্তা ও প্রতিযোগিতামূলক বিদ্যুৎ বাজার, অধিক নিরাপদ জ্বালানি ব্যবস্থা এবং ইউরোপের সঙ্গে আরও শক্তিশালী কৌশলগত সংযোগের ভিত্তি।




