ধর্মনগরী কোমে খামেনির শেষ বিদায়
১৬ কিলোমিটার জানাজার সারি

বিশাল শোকসাগরে পরিণত হয় ইরানের ধর্মনগরী কোম। ছবি: সংগৃহীত
ভোরের আলো ফোটার আগেই এক বিশাল শোকসাগরে পরিণত হয় ইরানের ধর্মনগরী কোম। রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরের শিয়া সম্প্রদায়ের পবিত্র ভূমি। ইরানের সাত দিনের শোকানুষ্ঠানের পঞ্চম দিনে (মঙ্গলবার) মাতম ওঠে কোম শহরেও। পবিত্র জামকারানের নীল গম্বুজ ছুঁয়ে কান্নার সুর ওঠে আকাশে। হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাসের গভীর বিষাদে ভারী হয়ে উঠেছিল পথের ধুলোকণাও। স্থানীয় সময় গতকাল সকাল ৬টায় জামকারান মসজিদে নামে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সৈয়দ আলি খামেনি ও তার পরিবারের শহীদ সদস্যদের লাশবাহী হেলিকপ্টার। মুহূর্তে যেন আকাশ কাঁপানো আর্তনাদে কেঁপে ওঠে পুরো কোম নগরী। একসঙ্গে কেঁদে ওঠে লাখো মানুষ। জামকারান মসজিদ থেকে হজরত ফাতিমা মাসুমা (সা.)-এর মাজারে যাওয়ার প্রতিটি সড়ক হয়ে উঠেছিল ‘শোকসাগর’।
আকাশ থেকে ধারণ করা দৃশ্যগুলোয় দেখা যায়, হজরত ফাতিমা মাসুমা (সা.)-এর মাজার থেকে শুরু করে পবিত্র জামকারান মসজিদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল জানাজার সারি। অর্থাৎ ১৬ কিলোমিটার। ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষের এই বিপুল উপস্থিতি এক স্মরণীয় দৃশ্য হয়ে থাকবে কোমের ইতিহাসে।
স্থানীয় সাংবাদিকরা এ দিনটিকে আখ্যা দিচ্ছেন ‘এক শতাব্দীর সবচেয়ে আবেগঘন ও ইতিহাস সৃষ্টিকারী বিদায়’ হিসেবে। এমন দৃশ্য, এমন জনসমুদ্র এবং এমন আবেগের সমাবেশ হয়তো বহু প্রজন্ম ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আজ তার লাশ নেওয়া হবে ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখান থেকে শোকযাত্রা হবে নাজাফ ও কারবালা শহরে। বৃহস্পতিবার নিজ জন্মভূমিতে মাশহাদ চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন ইরানের কাণ্ডারি।
মঙ্গলবার ভোরে ইরানের শীর্ষস্থানীয় আলেম গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আবদুল্লাহ জাওয়াদি আমোলি পবিত্র জামকারান মসজিদ প্রাঙ্গণে শহীদ নেতা ও তার পরিবারের সদস্যদের জানাজা পড়ান। ধর্মীয় আলেম, সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক কমান্ডারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই জানাজায় অংশ নেন। জানাজা শেষে শহীদ সর্বোচ্চ নেতা এবং তার পরিবারের শহীদ সদস্যদের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় হজরত ফাতিমা মাসুমা (সা.)-এর পবিত্র মাজারে।
শোকযাত্রার পুরো পথে মানুষ ধর্মীয় ও আবেগঘন স্লোগান দেন। গভীর শোক ও বেদনার পরিবেশে তারা শহীদ নেতা ও তার পরিবারের সদস্যদের মরদেহ শেষ বিদায় জানান।
অনেক শোকাহত মানুষের হাতে শহীদ নেতা এবং বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ মুজতাবা হোসেইনি খামেনির ছবি দেখা যায়। পুরো শোকযাত্রার পথে কালো শোকের পতাকা ও প্রতিশোধের লাল পতাকা উড়তে দেখা যায়। হাতে থাকা লাল পতাকাগুলোতে লেখা ছিল ‘ইয়া লিসারাতিল হুসাইন’, যা কারবালার চেতনা ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর রক্তের প্রতিশোধের প্রতীকী স্লোগান হিসেবে পরিচিত।
সোমবার বিকাল থেকেই ইরানের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে মানুষ কোমে আসতে শুরু করে। রাত পোহানোর আগেই জামকারান মসজিদের বিশাল প্রাঙ্গণ, আশপাশের সড়ক ও অপেক্ষার স্থানগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ভোর হওয়ার আগেই হাজার হাজার মানুষ দোয়া, কান্না ও শোকের আবহে তাদের প্রিয় নেতার শেষ বিদায়ের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। হেঁটে ও যানবাহনে করে আসা মানুষের মিছিল একসময় কোমের সড়কগুলোকে মানুষের এক অবিচ্ছিন্ন স্রোতে পরিণত করে।
চোখ যতদূর যায়, শুধু মানুষের কাতার
কোমের এই বিদায় অনুষ্ঠান শুধু একটি জানাজা ছিল না, এটি ছিল শোক, ভালোবাসা ও আনুগত্যের এক বিরল প্রকাশ। শহরের যেদিকেই চোখ যায়, দেখা যায় মানুষের সারি। মনে হচ্ছিল, পুরো কোম শহর যেন একসঙ্গে শোক পালন করছে । দাঁড়িয়ে আছে একই দোয়ার কাতারে ।
কোমভিত্তিক সাংবাদিকরা জানান, আজকের এই শোকযাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত তারা লিপিবদ্ধ করছেন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতার প্রতি মানুষের ভালোবাসা, আনুগত্য ও আবেগের এই বিরল অধ্যায়ের সাক্ষ্য সংরক্ষণ করতে পারে। তাঁদের ভাষায়, কোম আজ শুধু একটি শহর নয়; এটি পরিণত হয়েছে শোক, স্মৃতি এবং ইতিহাসের এক বিশাল মিলনমেলায়।
বিশাল জনসমুদ্র শোক ও বেদনার আবহের মধ্যেও মহাকাব্যিক ধর্মীয় স্লোগানে পুরো পরিবেশ মুখর করে তোলে। কোটি মানুষের এই উপস্থিতি ইসলামী উম্মাহর ভালোবাসা, আনুগত্য ও শ্রদ্ধার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এটি শুধু একটি জানাজা নয়, বরং একজন নেতার প্রতি জাতির গভীর আবেগ ও অঙ্গীকারের প্রকাশ।
শোকাহত মানুষের চোখে ছিল অশ্রু, কণ্ঠে ছিল দোয়া ও প্রিয় নেতার প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ। অনেকের হাতে ছিল শহীদ নেতার ছবি, আবার অনেকে ধর্মীয় স্লোগান ও শোকগাথার মাধ্যমে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
বিদায় শেষ নয়, স্মৃতির নতুন অধ্যায়
জানাজার নামাজ শেষ হয়েছে, কিন্তু শেষ হয়নি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ। লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায় প্রমাণ করেছে, তাঁদের কাছে এই মুহূর্ত শুধু একজন নেতার বিদায় নয়, বরং একটি আদর্শ, একটি সংগ্রাম এবং একটি ঐতিহাসিক সময়ের প্রতি গভীর অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ।
এর আগের দিন সোমবার রাজধানী তেহরানেও শহীদ নেতার বিদায় অনুষ্ঠানে লাখো মানুষের সমাগম হয়েছিল। রাজধানীর রাস্তাগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হওয়ার পর এবার পবিত্র নগরী কোমও প্রত্যক্ষ করল এক অভূতপূর্ব শোকযাত্রা। অনেকের কাছেই কোমের এই দিনটি শুধু একটি
রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং এটি ছিল ইতিহাসের এক আবেগঘন মুহূর্ত, প্রিয় নেতাকে অশ্রুসিক্ত হৃদয়ে বিদায় জানিয়েছে পুরো একটি জাতি।







