সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অচল বলিভিয়া, ৯০ দিনের জরুরি অবস্থা

সংগৃহীত ছবি
টানা ছয় সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়া। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে ৯০ দিনের জরুরি অবস্থা জারি করেছেন প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ। একই সঙ্গে সড়ক অবরোধ সরাতে মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী।
গতকাল শনিবার ভোরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক টেলিভিশন ভাষণে প্রেসিডেন্ট পাজ বলেছেন, ‘আন্দোলনকারীরা দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনের সর্বোচ্চ কঠোরতা প্রয়োগ করা হবে। জরুরি অবস্থার আওতায় বিক্ষোভের অধিকার সীমিত করা হবে এবং দেশের অভ্যন্তরে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সুযোগ থাকবে।’
গত ছয় সপ্তাহ ধরে শ্রমিক ইউনিয়ন, আদিবাসী গোষ্ঠী ও কোকা চাষিরা সরকারের অর্থনৈতিক নীতির প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ চালিয়ে আসছে। পাথর, গাছের গুঁড়ি ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দিয়ে মহাসড়ক বন্ধ করে দেওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। এতে অর্থনীতিতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
জরুরি অবস্থা ঘোষণার পরপরই এল আল্টো শহরে সেনা ও সশস্ত্র পুলিশের বহরকে বুলডোজারের সহায়তায় সড়ক অবরোধ সরাতে দেখা যায়। অনেক বাসিন্দা এ সময় নিরাপত্তা বাহিনীকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানান। কেউ কেউ পুলিশ সদস্যদের খাবারও তুলে দেন।
এল আল্টোর দোকানদার কার্লা বুতরন বলেছেন, ‘গত ৫০ দিনের বেশি সময় ধরে কাজকর্ম ও চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছি।’
রাজধানী লা পাজেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে সামরিক পুলিশ ও নৌবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট পাজ বলেছেন, ‘সড়ক অবরোধের কারণে মানুষ কাজ করতে পারছে না, চিকিৎসা নিতে পারছে না, এমনকি খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহেও বাধার মুখে পড়ছে। জরুরি অবস্থার লক্ষ্য মানুষের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা।’
গত বছর নির্বাচিত হওয়া রদ্রিগো পাজের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, তিনি উদারনৈতিক অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করছেন। আন্দোলনকারীরা তার পদত্যাগও দাবি করছেন।
সংকট নিরসনে সরকার আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি সপ্তাহে দেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন ‘বলিভিয়ান ওয়ার্কার্স সেন্ট্রাল’-এর সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছায় সরকার। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণ না করার আশ্বাস এবং ভবিষ্যতে আলোচনার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে সংগঠনটি আন্দোলন প্রত্যাহারে রাজি হয়েছে।
তবে কয়েকটি আদিবাসী সংগঠন এখনো আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দেশজুড়ে এখনও ৪০টির বেশি বড় সড়ক অবরোধ বহাল রয়েছে।
আদিবাসী নেতা লিদিয়া ক্যালিসায়া বলেছেন, ‘আমরা তাকে আর ক্ষমতায় দেখতে চাই না। তিনি দেশের নেতৃত্বে থাকুন, সেটাও চাই না।’
অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার অবসান চান অনেক সাধারণ নাগরিক। ট্রাকচালক এরলান্ড রিচার্ড সেগোভিয়া বলেছেন, ‘দিনের পর দিন সড়কে আটকে ছিলাম। এখন অন্তত মনে হচ্ছে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।’
এদিকে প্রেসিডেন্ট পাজ অভিযোগ করেছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস ও তার সমর্থকেরা সড়ক অবরোধের পেছনে জড়িত। তিনি তাদের ‘নার্কো-সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বামপন্থী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মোরালেস বর্তমানে এক অপ্রাপ্তবয়স্ককে পাচারের অভিযোগে মামলার মুখোমুখি। যদিও তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। মধ্য বলিভিয়ার চাপারে অঞ্চলে তার শক্তিশালী সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। যারা এতদিন পুলিশকে তাকে গ্রেপ্তার করতে বাধা দিয়ে আসছে।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মারকো আন্তোনিও ওভিয়েদো বলেছেন, ‘প্রয়োজন হলে মোরালেসকে গ্রেপ্তারে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালাবে।’ তার ভাষায়, ‘আইনের মুখোমুখি তাকে হতেই হবে।’
অন্যদিকে আত্মগোপনে থাকা মোরালেস দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘অতিমাত্রায় অনুগত’ বর্তমান রক্ষণশীল সরকারের বিরুদ্ধেই জনগণ আন্দোলন করছে।







