যুক্তরাজ্যের শক্তির পতন সুয়েজে, যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজে?

ছবি: রয়টার্স
সাল ১৯৫৬। বিশ্বের অন্যতম ‘সুপার পাওয়ার’ বা মহাশক্তি ফ্রান্স ও ব্রিটেন একযোগে হামলা করে মিসরে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় ইসরায়েলও। লক্ষ্য একটাই। গুরুত্বপূর্ন জলপথ সুয়েজ দখলে নেওয়া। তবে এই আগ্রাসন ছিল এক বড় ব্যর্থতা। পরবর্তী সময়ে সুয়েজ সংকট পরিণত হয় ব্রিটেনের মহাশক্তি হিসেবে মর্যাদা হারানোর প্রতীকে। প্রায় এক ও অভিন্ন পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেত্রেও। ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানে যৌথ হামলার পর থেকেই বন্ধ রয়েছে হরমুজ প্রণালি। সংকটে আরও একটি মহাশক্তি, যুক্তরাষ্ট্র। আজ, ইরান সংঘাত দেশটির ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে হওয়া ৭০ বছর আগের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
দ্য কনভার্সেশনের গত ২৯ অক্টোবরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন এক আশংকার কথা। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত পতন হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের। ঠিক যেমন সুয়েজ সংকটে পতন হয় যুক্তরাজ্যের। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর কয়েক মাস পরও অনেকাংশেই বন্ধ রয়েছে হরমুজ প্রণালী। এই সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থেকেছে যুক্তরাজ্য। তবে, ডিজেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির মধ্য দিয়ে এই সংকটের আঁচ পেয়েছে দেশটি। গুরুত্বপূর্ন জলপথ হরমুজ অবরোধের চিত্র মনে করিয়ে দেয় যুক্তরাজ্যের সুয়েজ দখলের ব্যর্থ প্রচেষ্টাকে। সুয়েজ ও হরমুজের মধ্যকার সাদৃশ্য কেবল দুটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উভয় সংকটই একই প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে, ভূ-রাজনৈতিক শক্তি অর্থনৈতিক শক্তিকে কতটা ছাড়িয়ে যেতে পারে?
মহাশক্তির পতন
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অধ্যাপক উইলিয়াম টি. আর. ফক্স ‘সুপারপাওয়ার’ বা ‘মহাশক্তি’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন ১৯৪৪ সালে। তিনি একে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, ‘বিপুল সম্পদ, বিশাল জনসংখ্যা এবং অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থানের’ ফলই হলো মহাশক্তি। বর্তমান সময়ে ইতিহাসবিদ ফিলিপস ও’ব্রায়েন ‘গ্রেট পাওয়ার’ বা ‘মহাশক্তি’কে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেন, তার সঙ্গে মিল রয়েছে ফক্সের এই সংজ্ঞার। সেই সময়ে ফক্স তিনটি রাষ্ট্রকে মহাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন। পরবর্তীকালে তিনি স্বীকার করেছিলেন, ব্রিটেনকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করাটা একটি ভুল ছিল; মূলত যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এবং পরবর্তীতে ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় ব্রিটেনের আপেক্ষিক অবনমনের কারণেই এমনটা ঘটেছিল। বর্তমানেও অনেকটা একই ধরনের পরিবর্তন ঘটছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটেন ছিল বিশ্বের প্রধান শক্তি এবং তারা এমন এক সুবিধা ভোগ করত, যাকে অর্থনীতিবিদরা অভিহিত করেন ‘অত্যধিক সুবিধা’ বলে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থায় ব্রিটিশ পাউন্ডের কেন্দ্রীয় ভূমিকার কারণে ব্রিটেন খুব সহজে এবং অনুকূল সুদের হারে ঋণ সংগ্রহ করতে পারত। এছাড়া লন্ডন ছিল তৎকালীন বিশ্বের প্রধান আর্থিক কেন্দ্র। তবে ব্রিটেনের প্রভাব কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই বিশেষ সুবিধাটি ধীরে ধীরে স্থানান্তরিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। সুয়েজ সংকটের সময় যুক্তরাজ্যের সুবিধা হারানোর বিষয়টি হয়ে ওঠে প্রকট। কেননা তখন ব্রিটিশ পাউন্ড পড়েছিল তীব্র চাপের মুখে। একইভাবে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি হিসেবে কাজ করা আর্থিক ব্যবস্থায়ও চাপের লক্ষন দেখা যাচ্ছে।
সুয়েজ সংকটের ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির মধ্যকার সম্পর্ক পালন করেছিল একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা। সুয়েজ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনের প্রধান পথ। আশঙ্কা ছিল, এটিকে জাতীয়করণ করা হলে যুক্তরাজ্যে ব্যাহত হতে পারে তেল সরবরাহ। কিন্তু পরিহাসের বিষয়, মিসের আক্রমণের সিদ্ধান্তের কারণেই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে তেলের ঘাটতি দেখা দেয় এবং আরোপ করতে হয় জ্বালানি রেশনিং। বর্তমানে হরমুজ নিয়ে অনেকটা একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সময় পার করছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি রয়েছে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে। এটি আরো স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে তাদের সামরিক সরঞ্জামের ভাণ্ডার কমে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। ইউক্রেনকে সমর্থনের কারণে তাদের সামরিক সরঞ্জামের ওপর চাপ ছিল, সেই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের ফলে সেই ভাণ্ডার আরও কমে গেছে।
সুয়েজ সংকট দেখিয়েছে, রাজনৈতিক নেতারা প্রায়শই তাদের ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাগুলো বুঝতে দেরি করে ফেলেন। আজকের যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৬ সালের ব্রিটেন নয়, তবুও ইরানের সঙ্গে সংঘাত মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।



