পর্দা নামল জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, অর্থনৈতিক বৈষম্য আর বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি কমতে থাকা আস্থার ছায়ায় শেষ হলো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা আলোচনায় বিশ্বনেতাদের কণ্ঠে বারবার ফিরে এসেছে একটি শব্দ— শান্তি। কিন্তু সেই শান্তি শুধু ঘোষণায় তৈরি হয় না। প্রয়োজন আস্থা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ। এই বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে।
‘বিশ্বাস পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য ফলপ্রসূ জাতিসংঘ’— এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে এবারের অধিবেশনে বৈশ্বিক সংকটের পাশাপাশি জাতিসংঘকে আরও কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক করার প্রশ্নও বিশ্বনেতাদের কণ্ঠে জোরালোভাবে উঠে এসেছে।
এই মঞ্চে বাংলাদেশের উপস্থিতি ছিল আলাদা মাত্রার। একদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে একজন বাংলাদেশি, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দৃশ্যমান কূটনৈতিক তৎপরতা। ২১ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন।
শান্তির ডাক, আস্থার সংকট: সাধারণ বিতর্কে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত, মানবিক বিপর্যয় ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধার প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার উঠে এসেছে। রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান এবং জাতিসংঘ সনদের নীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন নেতারা।
সভাপতি খলিলুর রহমান সাধারণ বিতর্ক শেষে যে ছয়টি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন, সেগুলো হলো— শান্তি, টেকসই উন্নয়ন, বৈষম্য, মানবাধিকার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আস্থার সংকট। বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতায় শান্তি এখন আর শুধু কূটনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নয়, জরুরি প্রয়োজন। উন্নয়নশীল ও ঋণঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য ন্যায্য অর্থায়ন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহায়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে অধিক প্রতিনিধিত্বের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবার কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এর সুফল যেন শুধু প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে আটকে না থাকে— এমন প্রশ্নও উঠেছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক শেষ হয়েছে। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির বড় প্রশ্নগুলোর কোনোটি শেষ হয়নি। গাজা ও অন্যান্য সংঘাত, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক ঋণ, উন্নয়ন অর্থায়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা— সব প্রশ্ন এখনো সামনে। আগামী মাসগুলোতে জাতিসংঘের বিভিন্ন কমিটিতে এসব নিয়ে আলোচনা চলবে। নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার এবং পরবর্তী মহাসচিব নিয়োগের মতো বিষয়ও গুরুত্ব পাবে।
তাই ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের বিতর্কের শেষকে কোনো সমাপ্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং নিউ ইয়র্কের মঞ্চে উচ্চারিত অঙ্গীকারগুলো বাস্তব নীতিতে ও মাঠপর্যায়ের ফলাফলে রূপ দেওয়ার পরীক্ষা এখন শুরু।
বিশ্বনেতারা শান্তির কথা বলেছেন। বলেছেন বহুপক্ষীয়তার কথা। বলেছেন আস্থা ফিরিয়ে আনার কথা। জাতিসংঘের সভাপতি খলিলুর রহমানের বার্তাতেও এসেছে একই উপলব্ধি— বিশ্বাস শুধু কথায় তৈরি হয় না, কথা ও কাজের সামঞ্জস্যেই তা অর্জন করতে হয়।
আর সেই পরীক্ষায় বাংলাদেশও নিজের জায়গা স্পষ্ট করেছে— গণতন্ত্র, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান, জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তির ন্যায্য প্রবেশাধিকারের পক্ষে।



