মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়াতে পারে ১০ হাজার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আলো নেই— বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো সব বিকল। পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদা-পানিতে তলিয়ে গেছে ঘরে ফেরার সব পথ। কিছুদূর পরপরই স্বজনদের আহাজারি; উদ্ধারকর্মীদের দিশাহারা তৎপরতা। ঢেউয়ে ঢেউয়ে লাশ ভিড়ছে ভোটেকোশী, নারায়ণী, ত্রিশূলি নদীর তীরে। দুদিন আগেই সেই চেনা মানুষগুলোই আজ নিথর দেহে পড়ে আছে সারি সারি। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়াতে পারে ১০ হাজার। যদিও নেপাল সরকারের কাগজ-কলম বলছে অন্য কথা।
শুধু নুয়াকোট নয়; দুদিন আগে (বুধবার) তিব্বতের হড়পা বানে ভেসে যাওয়া নেপালের সীমান্তঘেঁষা আট জেলাতেই এই একই দৃশ্য-যত্রতত্র লাশ! রসুয়া, তানাহুন, চিতওয়ান, ধাদিং, গোরখা, নওয়ালপারসি পূর্ব ও পশ্চিম— সবখানেই!
এর মধ্যেই শুরু হয়েছে নতুন আতঙ্ক। নেপাল-চীন সীমান্তে হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট নতুন হ্রদের পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে গতকাল শুক্রবার। খবর ছড়িয়ে পড়তেই জনপদে আছড়ে পড়েছে নতুন আতঙ্ক। ভয়ে কেউ ছুটছেন পাহাড়ে, কেউ ছাড়ছেন এলাকা। নেপাল-তিব্বত— দুই অঞ্চলেই এ দৃশ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে।
গতকালের সর্বশেষ বিবৃতিতে নেপাল পুলিশ বলছে, হিমালয়ের জলপ্রলয়ে নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭৯ জনে। নিখোঁজ ১৯২৪ জন। এর মধ্যে বিদেশি নাগরিকই ৫১৭ জন। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া, ব্রিটেন, সুইজারল্যান্ড, বুলগেরিয়াসহ ৩১ দেশের পর্যটক রয়েছেন এই বিশাল নিখোঁজের তালিকায়।
রসুয়ায় বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানির পরও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে কেন্দ্রীয় সরকারের উপস্থিতি দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরাও। রসুয়ার উত্তরগয়া গ্রামীণ পৌরসভার চেয়ারম্যান মাধব আরিয়াল বলছেন, উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসায় দ্রুত এবং কার্যকর হস্তক্ষেপ জরুরি। তার ভাষ্য, নুয়াকোটের বান্দ্রের পর আরও দুই গ্রামে গিয়ে পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখলে সাধারণ মানুষ শুধু বিদুর পৌরসভাতেই সরকারের উপস্থিতি দেখতে পান।
তিনি বললেন, মানুষ অভিযোগ করছে, কালো সানগ্লাস পরে আকাশে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারকে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেই সানগ্লাস দিয়ে মানুষের দুর্ভোগ দেখা যাচ্ছে না।
চেয়ারম্যান আরিয়ালের ভাষ্য, বন্যায় বেথ্রাবতী বাজার, কাইদলেটার, পাইরেবেসি, সাল্লেটার ও মাইলুংয়ে অকল্পনীয় ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। ভূমিকম্পে বাস্তুচ্যুত হয়ে ১১ বছর ধরে অস্থায়ী বসতিতে থাকা প্রায় ৩০০ পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রিশূলি-৩বি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক এবং আপার ত্রিশূলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত কোরীয়, চীনা, ভারতীয় ও নেপালি শ্রমিকদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাদের কেউ কেউ টানেলের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলেও খবর পাওয়া গেছে।
গোসাইনকুণ্ড ও মানসসরোবরের উদ্দেশে যাওয়া নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান ও উদ্ধারের জন্যও স্বজনরা আবেদন জানাচ্ছেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান আরিয়াল।
তার মতে, তিমুরে ও সিয়াব্রুবেশিতে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে। আর মাইলুং, সাল্লেটার, পাইরেবেশি, কাইদলেটার ও বেথ্রাবতীতে ধ্বংসযজ্ঞ আরও বেশি। বিপুলসংখ্যক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছেন।
আরিয়াল বললেন, গুরুতর আহতদের সরিয়ে নিতে হেলিকপ্টারের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় তার আবেদনে সাড়া দেওয়া হয়নি। ফলে গুরুতর আহত কয়েকজনকে কালিকাস্থান ও জিবজিবের হাসপাতাল হয়ে প্রায় ১০ ঘণ্টা পর ধুনছে হাসপাতালে নিতে হয়েছে।
আরিয়াল বললেন, বন্যাকবলিত এলাকায় নদীর তীরে সারি সারি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। স্বজনরা শনাক্ত করার পরও অনেক মরদেহ তাৎক্ষণিক সৎকার করা সম্ভব হয়নি। মাঠপর্যায়ে পুলিশের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানিয়েছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া কিছু করার নেই। নদীর তীরে মরদেহ পচতে শুরু করায় আশপাশের বসতিতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। এতে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন। আর যারা দায়িত্ব পালন করছেন, তারাও সীমিত সম্পদ নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। কালিকাস্থানে একজন পরিদর্শকসহ প্রায় পাঁচ-ছয়জন পুলিশ সদস্য পর্যাপ্ত খাবার ও পানি ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।
সরকারের উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায় অসন্তোষ প্রকাশ করে আরিয়াল বললেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের উপস্থিতি টের পাচ্ছেন না। তিনি বললেন, একটি সমবায় কার্যালয়ের ব্যাকআপ বিদ্যুৎ দিয়ে মোবাইল চার্জ করে পরে প্রধানমন্ত্রীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট পড়েছেন তিনি। তার ভাষায়, তারা যে এলাকায় রয়েছেন, সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারকে শুধু আকাশে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে।
নুয়াকোটের সাংবাদিক ও আইনজীবী নবদীপ শ্রেষ্ঠও একই অভিযোগ করেছেন। তার মন্তব্য, সুনামির পর যে সরকারের উপস্থিতি দেখা গিয়েছিল, তুলনামূলক ছোট এই বন্যার পরও তার চেয়ে কম দৃশ্যমান সরকার। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ও প্রতিশ্রুতি প্রকাশ না করে সরকারকে সরাসরি দুর্যোগকবলিত এলাকায় গিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। এতে মানুষ বাস্তবে সরকারের উপস্থিতি অনুভব করতে পারবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আরিয়াল বললেন, পরিস্থিতি নিয়ে কয়েকটি গণমাধ্যমে কথা বলার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সচিবালয় থেকে তাকে ফোন করা হয়। তাকে নেতিবাচক প্রচার বা রাজনীতিতে জড়াতে নিষেধ করা হয় বলে দাবি তার। জবাবে তিনি বললেন, সরকার এমন পরিস্থিতি তৈরি করুক, যাতে স্থানীয় প্রতিনিধিদের এ ধরনের অভিযোগ তুলতে না হয় এবং মানুষ সত্যিকার অর্থে সরকারের উপস্থিতি অনুভব করতে পারে।
মন্ত্রীদের এক মাসের বেতন: বন্যাকবলিত মানুষের সহায়তায় নিজেদের এক মাসের বেতন প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দেশটির মন্ত্রীরা। গতকাল অনুষ্ঠিত এক মন্ত্রিপরিষদ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এদিন আরও বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে পুনর্বাসন প্যাকেজ অন্যতম।







