নিজ সন্তানকেই অপহরণ করেন জাপানিরা!

ছবি: রয়টার্স
কয়েক মিনিটের জন্য বাইরে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে দেখলেন, ঘর খালি—সন্তান নেই। কোনো ফোন নেই, কোনো ঠিকানা নেই, নেই ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তাও। জাপানে বছরের পর বছর এভাবেই বিবাহবিচ্ছেদের পর হাজারো বাবা-মা কার্যত নিজেদের সন্তানের জীবন থেকে মুছে গেছেন। অবশেষে বহু বিতর্ক ও দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পথে হাঁটছে দেশটি।
দেশটিতে বিবাহবিচ্ছেদের সময় প্রায়ই বাবা বা মায়ের একজন সন্তানকে নিয়ে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যেতেন, ফলে অন্য অভিভাবক সন্তানের কোনো খোঁজই পেতেন না। এ ধরনের ঘটনায় সাধারণত যে অভিভাবক আগে সন্তানকে নিয়ে চলে যেতেন, তিনিই সন্তানের অভিভাবকত্ব পেতেন। তবে চলতি বছরের এপ্রিলে কার্যকর হওয়া দেওয়ানি আইনের সংশোধনের মাধ্যমে এ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন বিবাহবিচ্ছেদের পর উভয় অভিভাবকই সন্তানের আইনগত অভিভাবক হতে পারবেন। আগে শুধু একজন, সাধারণত যার কাছে সন্তান থাকত, তিনিই সব ধরনের অভিভাবকত্বের অধিকার ধরে রাখতেন।
আগের একক অভিভাবকত্ব ব্যবস্থায় বিচ্ছেদের পর শুধু একজন অভিভাবকেরই আইনগত অধিকার থাকত। ফলে সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হোক না কেন, অন্য অভিভাবককে সন্তানের জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হতে হতো, যদি না অভিভাবকত্ব পাওয়া ব্যক্তি দেখা করার অনুমতি দিতেন।
পুরনো আইন আগে সন্তানকে নিয়ে চলে যাওয়ার প্রবণতাকে উৎসাহিত করত। পারিবারিক আইনজীবীরা অনেক সময় তাদের মক্কেলকে পরামর্শ দিতেন, বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করার আগে সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে যেতে। কারণ এতে আদালতে অভিভাবকত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যেত। জাপানে এ ধরনের কাজ বেআইনি ছিল না, যদিও অন্য অনেক দেশে এটিকে শিশু অপহরণ হিসেবে গণ্য করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার দ্বৈত নাগরিক আনাস্তাসিয়া মিনকোভা, যিনি তার স্বামী ও ছেলেকে নিয়ে শিকোকু দ্বীপে বসবাস করতেন, জাপানের এই পুরোনো আইনের শিকারদের একজন। সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া সফর শেষে ফিরে এসে দেখেন, তার স্বামী দুই বছরের ছেলেকে নিয়ে চলে গেছেন। এরপর থেকে তিনি কেবল সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তত্ত্বাবধানে ছেলের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে একটি সাক্ষাৎ ছিল শিশুদের একটি কেন্দ্রে মাত্র ৩০ মিনিটের।
মিনকোভা বললেন, ‘আমার ছেলে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল এবং কিছুতেই ছাড়তে চাইছিল না। সে তার মাথা আমার বুকে রেখে ছিল। মনে হচ্ছিল, আমাকে আবার দেখে সে স্বস্তি পেয়েছে। সময় শেষ হয়ে গেলে আমার হৃদয় ভেঙে গিয়েছিল।’
এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া মিনকোভা একা নন। টোকিওতে বসবাসকারী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এমিলি সাতো জানান, ২০২২ সালে তার স্বামী তাদের মেয়েকে নিয়ে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যান। মামলাটি আদালতে পৌঁছানোর সময় পর্যন্ত বাবার সঙ্গে মেয়ের বসবাসকে স্থিতিশীল অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
একইভাবে সিয়াটলের বাসিন্দা জেফেরি মোরহাউস গত ১৬ বছর ধরে তার ছেলের থেকে বিচ্ছিন্ন। তার সাবেক স্ত্রী ছেলেকে নিয়ে জাপানে চলে যাওয়ার পর থেকে তিনি আর সন্তানের সঙ্গে থাকতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী তিনি ঘটনাটিকে ‘শিশু অপহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বললেন, ‘তখন তার বয়স ছিল সাড়ে ছয় বছর। শেষবার আমি মোচিকে জড়িয়ে ধরেছিলাম, শেষবার তার কণ্ঠ শুনেছিলাম ২০১০ সালের বাবা দিবসে। মোচি, তুমি যেখানেই থাকো, আমি তোমাকে ভালোবাসি।’
জাপানের বিচার মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, নতুন আইন অনুযায়ী বিবাহবিচ্ছেদকারী বাবা-মাকে একে অপরের অধিকারকে সম্মান করতে হবে। অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ চলাকালে যদি কোনো অভিভাবক একতরফাভাবে সন্তানকে নিয়ে চলে যান, তাহলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
তবে কয়েকজন আইনজীবীর মতে, নতুন আইন যৌথভাবে সন্তান লালন-পালনের সময় নিশ্চিত করে না এবং যৌথ অভিভাবকত্বেরও পূর্ণ নিশ্চয়তা দেয় না।
অধিকারকর্মীদের মতে, সংশোধিত আইনে অভিভাবকের মাধ্যমে সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি। একই সঙ্গে যৌথ অভিভাবকত্ব কার্যকর করার কোনো বাস্তব প্রয়োগব্যবস্থাও রাখা হয়নি। ফলে আইনগতভাবে অভিভাবকত্বের পরিধি বাড়লেও সমস্যার মূল কারণগুলো এখনো বহাল রয়েছে।




