জ্ঞানের আলো নিভছে মিয়ানমারে
- ৬০ লাখ শিশুর ভাগ্যে অন্ধকারের হাতছানি

৬৩ লাখেরও বেশি স্কুলগামী শিশু বিদ্যালয়ে যাচ্ছে না
বই-খাতা হাতে স্কুলে দৌড়ানোর বয়সে মিয়ানমারের শিশুদের দিন কাটছে সংশয়ের মধ্যে। গোটা একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। অন্ধকারে। যে বয়সে প্রতিটি শিশুর মনবিকাশে জ্ঞানের আলো প্রয়োজন সেই বয়সে শিক্ষার আলো নিভছে মিয়ানমারে। ইন্সটিটিউট অব স্ট্রাটেজি অ্যান্ড পলিসি মিয়ানমারের (আইএসপি- মিয়ানমার) এক রিপোর্টে (২৪ জুন) দেশটির শিক্ষাব্যাবস্থার এ উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে দেশটির ৬৩ লাখেরও বেশি স্কুলগামী শিশু বিদ্যালয়ে যাচ্ছে না।
মিয়ানমারজুড়ে স্কুলগামী শিশুদের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের সমান। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে অন্ধকারের অতল গহবরে হারিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারে শিক্ষার আলো। শিক্ষাব্যবস্থায় এমন বড় ধাক্কায় গভীর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েঠে দেশটির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
আইএসপি’র রিপোর্ট অনুযায়ী , ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটির শিক্ষাবস্থা নিম্নগতি। সংস্থাটির পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে স্কুলে ভর্তি ছিল প্রায় ৯৭ লাখ শিশু। তবে অভ্যুত্থানের পর এ সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩০ লাখ। কারণ হিসেবে রিপোর্টিতে উল্লেখ করা হয়েছে কয়েকটি বিষয়। এরমধ্যে আছে দারিদ্র্য, সশস্ত্র সংঘাত এবং যুদ্ধজনিত কারণে স্থানন্তর শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বাধা।
মিয়ানমারের হাজারো শিশু স্বেচ্ছায় শিক্ষা অর্জন করতে চাইলেও বিভিন্ন বাঁধা এবং অর্থ সংকটে তারা দিশেহারা। ইয়াঙ্গুন শহরের দু সন্তানের মা ইরাবতিকে জানিয়েছেন, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েকে স্কুলে পাঠানো বন্ধ করতে হয়েছে তাকে। ‘স্কুলটি বিনামূল্যে হলেও বই ও ইউনিফর্মের জন্য যে খরচ হয়, তা বহন করার সামর্থ্য আমার নেই,’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। সাধারণ একজন দিনমজুরের আয়ে নিজের সন্তান্দের স্কুলে পাঠাতে না পারার কষ্ট তার কথায় স্পষ্ট। শুধু অর্থের অভাবে নয়, অনেক অভিভাবক নিজ সন্তানের জানের ভয়ে তাদের স্কুলে যাওয়া থেকে বিরত করছে বলেও থাইল্যান্ড থেকে প্রকাশিত এ পত্রিকাটিকে জানিয়েছেন অনেকেই।
সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে নিজস্ব একটি শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছে ন্যাশনাল ইউনিটি গভার্মেন্ট (এনইউজি)। জান্তা পরিচালিত স্কুল-কলেজে পড়তে অনাগ্রহী শিক্ষার্থিদের জন্য চালু করা হয় এ শিক্ষাব্যবস্থা। প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে চলমান প্রায় ৬ হাজার স্কুলে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি ছিল ৭ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। এ অঞ্চলের শিক্ষা কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন, ‘অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিরাপত্তার বিষয় ভেবে তাদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন। আবার অনেক অভিভাবক বিমান হামলার ভয়ে সন্তানদের সেনাশাসিত স্কুলে পাঠাচ্ছেন।‘
২০২৫ সালের মে মাসে সাগাইং অঞ্চলের এনইউজি পরিচালিত একটি স্কুলে বিমান হামলা করে মিয়ানমারের রেজিম। ২২ জন শিক্ষার্থী ও ২ শিক্ষকের মৃত্যু হয় ওই হামলায়। আহত কয়েকশ। এমন আরও আক্রমণের ভয় থেকে স্কুল কেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন মা-বাবারা।
দেশটির দেপায়িং অঞ্চলের এক বাবা জানিয়েছেন, ‘আমার ছেলে শুধু ইংরেজি আর বার্মিজ (প্রাথমিক শিক্ষা) বলতে, লিখতে পারলেই হবে। পরে তাকে ভোকেশনাল ট্রেনিং-এর জন্য কোথাও ভর্তি করার কথা বিবেচনা করতে পারি।‘ চলমান এ সংকট মোকাবেলায় সরকার একেবারে উদাসীন তাও নয় , চলতি বছরের মে মাসে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া শিশুদের পাঠ্যদান কর্মসূচি পুনরায় ফেরত আনতে এরইমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। চালু করেছে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নতুন ‘প্লেসমেন্ট টেস্ট’ বা যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষার ব্যবস্থা । ২০২১ সাল থেকে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে এমন শিক্ষার্থীদের আবার সুযোগ করে দেয়াই মূল উদ্দেশ। তবে এই ব্যবস্থাটি প্রাথমিক আর মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্যই প্রযোজ্য। ফলে উচ্চমাধ্যমিক বা কলেজগামী অনেক শিক্ষার্থীই আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় ফিরে আসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ।
উল্লেখ, ২০২৫ সালের বৈশ্বিক শান্তি সূচকের তথ্য অনুযায়ী এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি অশান্তি বিরাজ করছে মিয়ানমারে। দেশটিতে ২০২৩- ২৪ সালে ২১৭টি হামলা হয় স্কুলে। ২০২৫ সালে দুটি স্কুল হামলায় প্রাণ হারায় ১৮ জন, যার অধিকাংশ শিক্ষার্থী। জান্তাবিরোধী
প্রতিরোধ গড়ে তোলাই চাকরি হারিয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষক। প্রাণ হারিয়েছেন ৩৭ জন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষার সাথে জড়িত সবার এমন নির্মম অবস্থা দেখেই সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন অবিভাবকরা।




