আফ্রিকার কৃষিতে চীনের প্রভাব

নাইজেরিয়াকে কেন্দ্র করে চীনের এই কৃষি উদ্যোগ দিনে দিনে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
নাইজেরিয়ার রাজধানী আবুজার বাইরে গ্রিন অ্যাগ্রিকালচার ওয়েস্ট আফ্রিকা লিমিটেডের (গাওয়াল) কার্যালয়। স্থানীয়দের কাছে অবশ্য এই প্রতিষ্ঠানের নাম খুব পরিচিত নয়। তারা জায়গাটিকে চেনে ‘চীনারা যে জায়গায় জাদুর ধানের বীজ দেয়’এই পরিচয়ে। এই বীজের সঙ্গে নিজের ভাগ্য বদলের গল্প জুড়ে গেছে ৪২ বছর বয়সী কৃষক আহমেদ ইউসুফের। গাওয়ালের বীজ ব্যবহারের আগে হেক্টরপ্রতি তাঁর ধানের ফলন ছিল মাত্র ২ টন। এক দশকের বেশি সময় চাষ করেও লোকসান হচ্ছিল। পরিবারের খরচ মেটাতে না পেরে কৃষিকাজ ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবছিলেন তিনি। পরে গাওয়ালের আর-১ জাতের ধান চাষ করে একই পরিশ্রমে ফলন বাড়ে তিন গুণেরও বেশি২০১৭ সালে নাইজেরিয়ায় নিয়ে আসা আর-১ জাতটি রোগপ্রতিরোধী এবং বিভিন্ন ধরনের জমিতে চাষ করা যায়। এর ফলন হেক্টরপ্রতি ৭.৫ থেকে ৮ টন। গাওয়ালের ফারো ৬৯ ও ফারো ৭০ জাতের ফলন আরও বেশি- হেক্টরপ্রতি ১১ থেকে ১৩ টন পর্যন্ত।
২০০৬ সালে চীনের হুনান প্রদেশের চাংশাভিত্তিক ইউয়ান লংপিং হাই-টেক এগ্রিকালচার এবং বেইজিংয়ের রাষ্ট্রায়ত্ত সিজিসিওসি গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে গাওয়াল প্রতিষ্ঠিত হয়। নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় কেব্বি রাজ্যে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ২ হাজার হেক্টরের প্রদর্শনী খামার। সেখানে ৫ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র কৃষক বীজ, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সুবিধা পান। কোম্পানির দাবি, উন্নত জাতের ধান ব্যবহারের ফলে নাইজেরিয়ার বার্ষিক ধান উৎপাদন ২০ লাখ টন পর্যন্ত বেড়েছে। দেশটিতে বছরে প্রায় ১০.৫ মিলিয়ন টন ধানের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন হয় প্রায় ৭ মিলিয়ন টন।
গাওয়ালের আর-১ জাত তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছয় চীনা ও দুই নাইজেরীয় গবেষকের দলের সদস্য শু গোশিন ২০১৪ সালে নাইজেরিয়ায় আসেন। ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, বাজরা, চিনাবাদাম, জোয়ারসহ বিভিন্ন ফসলের উন্নত জাতও সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
নাইজেরিয়াকে কেন্দ্র করে চীনের এই কৃষি উদ্যোগ এখন আরও বিস্তৃত। বুরকিনা ফাসো, ইথিওপিয়া, গিনি ও জিম্বাবোয়েতেও সিজিসিওসি কৃষি সহযোগিতায় যুক্ত। মোজাম্বিক ও তানজানিয়ায় রয়েছে চীনের ‘ফ্রেন্ডশিপ ফার্ম’। মার্চে নাইজেরিয়া চীনের সঙ্গে ৯০০ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্পের ঘোষণা দেয়। এর আওতায় ৬টি বিশাল পোলট্রি খামার গড়ে প্রতিদিন ৬০ লাখ ডিম উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
চীনের এই মডেল পশ্চিমা উন্নয়ন সহায়তার প্রচলিত পদ্ধতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। পশ্চিমা সহায়তায় মানবাধিকার, সুশাসন ও পরিবেশ সুরক্ষার মতো শর্ত থাকে। চীনের পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে কম শর্তনির্ভর। ফলে আফ্রিকার অনেক দেশের কাছে তা বেশি বাস্তবসম্মত বলে মনে হচ্ছে। চীনের প্রভাব বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রও কৃষি খাতে সক্রিয় হচ্ছে। মার্কিন কৃষি দফতর কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য ঋণের নিশ্চয়তা, কৃষি সরঞ্জাম, বিশেষ জাতের বীজ ও সার সরবরাহে সহায়তা করছে। ফলে আফ্রিকার কৃষিক্ষেত্রে প্রতিযোগিতাটি আর শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উন্নত বীজ, যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ, বাজার এবং অর্থায়নের মাধ্যমে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশই আফ্রিকার কৃষির ভবিষ্যৎ ও নিজেদের প্রভাব দুটিই গড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ভাষান্তর : রুবাইয়া জেসমিন




