আয়ারল্যান্ডে সরকারি কর্মচারীদের ধর্মঘট, ব্যাহত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা

ছবি: রয়টার্স
বেতন বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে মজুরির সামঞ্জস্য এবং নতুন জাতীয় বেতনচুক্তির দাবিতে আয়ারল্যান্ডে ধর্মঘট করেছেন শিক্ষক, নার্স, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন খাতের সরকারি কর্মচারীরা। গত ১৪ অক্টোবরের ২৪ ঘণ্টার এই কর্মবিরতিতে দেশটির শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সরকারি পরিষেবা ব্যাহত হয়। প্রায় দুই দশকের মধ্যে এটি দেশটির সরকারি খাতের অন্যতম বৃহৎ ধর্মঘট বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আরটিই ও বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ধর্মঘটের কারণে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ থাকে। হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎ বাতিল হয়। জরুরি স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখা হলেও ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ রোগীরা। সরকারি দপ্তরসহ অন্যান্য পরিষেবাতেও পড়ে কর্মবিরতির প্রভাব।
এই অসন্তোষের মূল কারণ নতুন জাতীয় বেতনচুক্তি নিয়ে সরকার ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোর দীর্ঘদিনের মতবিরোধ। ইউনিয়নগুলোর দাবি, মূল্যস্ফীতির তুলনায় বেতন বৃদ্ধির হার কম হওয়ায় কর্মীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। নতুন চুক্তিতে বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি অতীতের মূল্যস্ফীতিজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
অন্যদিকে, সরকার বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনার পাশাপাশি সরকারি ব্যয় বহনের সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা এবং পরিষেবার কার্যকারিতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। রয়টার্সের ১২ অক্টোবরের প্রতিবেদনেও নতুন বেতনচুক্তি নিয়ে বিরোধকে ধর্মঘটের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
আয়ারল্যান্ডে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিও কর্মীদের অসন্তোষ বাড়িয়েছে। বাসাভাড়া, জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় চাপে পড়েছে কর্মজীবী মানুষের পারিবারিক বাজেট। ইউনিয়নগুলোর বক্তব্য, বেতন নামমাত্র বাড়লেও মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে সেই বৃদ্ধির সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের চাপ ও দায়িত্ব বাড়ার পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে পেশাভেদে বেতন কাঠামো আলাদা হওয়ায় সব কর্মচারীর ক্ষেত্রে একই হারে বেতন বৃদ্ধি বা ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের দাবি প্রযোজ্য নয়।
শিক্ষক সংগঠন আইএনটিও নতুন বেতনচুক্তিতে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, অতীতের মূল্যস্ফীতিজনিত ক্ষতি বিবেচনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কর্মীদের প্রকৃত আয় সুরক্ষার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। অন্যদিকে, নার্স ও মিডওয়াইফদের সংগঠন আইএনএমও স্বাস্থ্যসেবায় কর্মীদের কাজের চাপ, জনবলসংকট ও কর্মপরিবেশের বিষয়গুলো সামনে এনেছে। সংগঠনগুলোর মতে, ন্যায্য পারিশ্রমিক ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি পরিষেবায় দক্ষ কর্মী ধরে রাখা কঠিন হবে।
পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘটের আগে সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন ‘ওয়ার্ক-টু-রুল’ কর্মসূচিও পালন করে। এ কর্মসূচিতে কর্মীরা চুক্তিতে নির্ধারিত দায়িত্ব ও কর্মঘণ্টা অনুসরণ করেন এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকেন। এতে পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘটের আগেই সরকারি পরিষেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হয়। ইউনিয়নগুলোর ভাষ্য, দীর্ঘদিনের অসন্তোষের পর ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান পাওয়া গেলে এ কর্মসূচি এড়ানো সম্ভব ছিল।
ধর্মঘটের পর বিরোধ নিরসনে সরকার ও ইউনিয়নগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতাভিত্তিক আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। রয়টার্সের ১৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় ২১ অক্টোবরের জন্য নির্ধারিত পরবর্তী ধর্মঘট কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। তবে এতে চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ, নতুন চুক্তির মেয়াদ এবং মূল্যস্ফীতিজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে সিদ্ধান্ত এখনো আলোচনার ওপর নির্ভর করছে।
আয়ারল্যান্ডের এই ধর্মঘট সরকারি কর্মচারীদের বেতন, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে চলমান বিতর্ককে সামনে এনেছে। একদিকে কর্মীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি, অন্যদিকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা সচল রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ফলে কর্মীদের দাবি বিবেচনার পাশাপাশি সরকারি পরিষেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গ্রহণযোগ্য বেতনচুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কর্মীদের অসন্তোষ পুরোপুরি কাটবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।




