ব্রিটেনে এমন ভোট আগে দেখেনি কেউ
- ৫০ লাখ পাউন্ডের বিতর্ক নিয়ে ফের ভোটে ফারাজ
- মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ডাস্টবিন মাথায় ‘কাউন্ট বিনফেস’

ছবি : বিবিসি
একদিকে ব্রেক্সিটের অন্যতম প্রধান মুখ ও রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ। অন্যদিকে মাথায় ডাস্টবিনের আদলে ধাতব হেলমেট, গায়ে মহাকাশযোদ্ধার পোশাকে ‘কাউন্ট বিনফেস’। বৃহস্পতিবার ব্রিটেনের এসেক্সের ক্ল্যাকটন আসনের উপনির্বাচনে মুখোমুখি হয়েছেন এই দুই ব্যতিক্রমী প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে তাদের লড়াই ছাপিয়ে এবার ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে আরও বড় এক ঘটনা, ব্রিটিশ সংসদীয় নির্বাচনে রেকর্ড ৩৪ জন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে, চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত। ক্ল্যাকটন-অন-সি ছাড়াও জেওয়িক, ফ্রিন্টন ও ওয়ালটন-অন-দ্য-নেজ এলাকার মোট ৭৯ হাজার ৭৮৫ জন নিবন্ধিত ভোটার এই নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। মোট প্রার্থীর মধ্যে ২০ জন স্বতন্ত্র; প্রতিনিধিত্ব রয়েছে ১২টি রাজনৈতিক দলের। ব্রিটিশ সংসদীয় নির্বাচনে এত প্রার্থীর লড়াই আগে দেখা যায়নি। ২০০৮ সালের হালটেমপ্রাইস অ্যান্ড হাওডেন উপনির্বাচনে ২৬ জন প্রার্থী ছিলেন, যা এত দিন রেকর্ড ছিল।
এই উপনির্বাচনের সূত্রপাত ফারাজের নিজের সিদ্ধান্তেই। জুলাইয়ের শুরুতে ক্ল্যাকটনের এমপি পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই একই আসনে ফের প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। তার ভাষ্য, এই ভোট ‘জনগণ বনাম প্রতিষ্ঠান’-এর লড়াই। কিন্তু লেবার, কনজারভেটিভসহ ব্রিটেনের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনটিকে রাজনৈতিক কৌশল ও অপ্রয়োজনীয় আয়োজন আখ্যা দিয়ে প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ছোট দল, স্বতন্ত্র এবং ব্যতিক্রমী প্রার্থীদের ভিড়ে সবচেয়ে আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন কাউন্ট বিনফেস।
‘কাউন্ট বিনফেস’ আসলে কৌতুকাভিনেতা ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গবিদ জন হার্ভির তৈরি চরিত্র। বিনের মতো হেলমেট পরে প্রচারে নামা এই ‘মহাকাশযোদ্ধা’ এর আগেও ব্রিটেনের একাধিক নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীসহ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন। সাধারণত এমন ব্যঙ্গাত্মক প্রার্থীরা নির্বাচনে আলোচনার রসদ জোগালেও এবার পরিস্থিতি আলাদা, ক্ল্যাকটনে ফারাজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই উঠে এসেছে বিনফেসের নাম।
ফারাজের পদত্যাগের নেপথ্যে রয়েছে তার আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিতর্ক। থাইল্যান্ডভিত্তিক ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসায়ী ও ধনকুবের ক্রিস্টোফার হারবোর্নের কাছ থেকে ২০২৪ সালে পাওয়া ৫০ লাখ পাউন্ডের একটি উপহার তিনি যথাযথভাবে ঘোষণা করেছিলেন কি না, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডার্ডস কমিশনার। ফারাজের দাবি, অর্থটি ছিল ব্যক্তিগত উপহার এবং তা ঘোষণার বাধ্যবাধকতা তাঁর ছিল না। অর্থের একটি অংশ ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় ব্যবহৃত হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ফারাজ পদত্যাগ করায় সংসদীয় তদন্তটি সাময়িকভাবে স্থগিত হয়েছে। তবে তিনি আবার নির্বাচিত হলে তা ফের শুরু হতে পারে। তদন্তে সংসদীয় বিধি ভঙ্গের প্রমাণ মিললে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে; পরিস্থিতি এমন পর্যায়েও যেতে পারে যে ক্ল্যাকটনে আরও একটি উপনির্বাচনের প্রয়োজন পড়বে। ফারাজ অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, সংবাদমাধ্যম নয়, তার কাজের বিচার ক্ল্যাকটনের ভোটারদেরই করা উচিত।
বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইভেট কুপারও এই উপনির্বাচনের সমালোচনা করেছেন। তার বক্তব্য, ভোটটি হওয়ারই কথা নয়; ফারাজ সবার জন্য প্রযোজ্য নিয়মের প্রশ্ন এড়াতে রাজনৈতিক নাটক তৈরি করছেন। প্রধান দলগুলোর সরে দাঁড়ানোর ফলে সেই ভোটই শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ রাজনীতির এক অস্বাভাবিক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে।
তবে জনমত সমীক্ষায় ফারাজ এখনও অনেকটা এগিয়ে। ম্যান্ডেট রিসার্চের জন্য সারভেশনের করা ক্ল্যাকটনভিত্তিক সমীক্ষায় সিদ্ধান্ত নেওয়া ভোটারদের মধ্যে ফারাজের সমর্থন ৭৩ শতাংশ, কাউন্ট বিনফেসের ২০ শতাংশ। লরেন্স ফক্সের সমর্থন ২ শতাংশ, অন্য প্রার্থীরা মিলিয়ে ৫ শতাংশ। ১৬ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত ক্ল্যাকটনের ৫০২ জন প্রাপ্তবয়স্কের উপর ওই সমীক্ষা চালানো হয়।
ফারাজের কাছে ক্ল্যাকটন অবশ্য অপরিচিত মাটি নয়। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ২১ হাজার ২২৫ ভোট পেয়ে ৪৬.২ শতাংশ ভোটের সমর্থনে আসনটি জিতেছিলেন তিনি। সেটিই বহুবার চেষ্টা করার পর ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তাঁর প্রথম জয়। সে বার ভোট পড়েছিল ৫৮ শতাংশের কিছু বেশি।
এ বার তাই প্রশ্ন শুধু ফারাজ জিতবেন কি না, তা নয়। নজর থাকবে তার জয়ের ব্যবধান এবং মাথায় ‘বিন’ পরা ব্যঙ্গাত্মক প্রার্থী কতটা ভোট টানতে পারেন, তার দিকেও। ৩৪ প্রার্থীর প্রায় এক মিটার দীর্ঘ ব্যালট পেরিয়ে ক্ল্যাকটনের ভোটাররা কী রায় দেন, তার ফল জানা যাওয়ার কথা স্থানীয় সময় শুক্রবার সকালে।







