হ্যান্ডবল কেন উল্টোরথে?
- ঘরোয়া খেলায় ভীষণ সক্রিয় বাংলাদেশ হ্যান্ডবল ফেডারেশন কখনোই নজর দেয়নি আন্তর্জাতিক সাফল্যে
- ২৬ বছর পর দেশে হতে যাচ্ছে সিনিয়র পর্যায়ের আন্তর্জাতিক আসর
- ২০১৯ এসএ গেমসের পর প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলবেন বাংলাদেশের মেয়েরা
- অতীতের ভুল বুঝতে পেরে আন্তর্জাতিক সাফল্যে চোখ রেখেছেন বর্তমান ফেডারেশন কর্তারা

পল্টন মাঠের পাশে হ্যান্ডবল স্টেডিয়ামে কয়েকদিন ধরেই চলছে ঝাড়-পোছের কাজ। স্টেডিয়ামের দেয়ালে পড়েছে নতুন রঙের আঁচড়, রাতের স্টেডিয়াম সেজেছে নানান রঙের নিয়ন বাতিতে। হ্যান্ডবল ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের ব্যস্ততার শেষ নেই। সবখানেই একটা উৎসবের আমেজ। হবেই বা না কেন? ২৬ বছর পর এখানে বসতে যাচ্ছে সিনিয়র পর্যায়ের কোনো আন্তর্জাতিক আসর। আজ থেকে শুরু হবে বেগম খালেদা জিয়া আইএইচএফ নেশন্স ট্রফি। বাংলাদেশ ছাড়াও অংশ নেবে ভারত, নেপাল ও মালদ্বীপের নারী হ্যান্ডবল দল।
আঙিনায় দীর্ঘদিন পর আন্তর্জাতিক আসরে খেলার সুযোগটা কাজে লাগাতে শেষ মুহূর্তে ঘাম ঝরাচ্ছেন খেলোয়াড়রা। তারাও যে দীর্ঘ চার বছর পর কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পাচ্ছেন।
সুযোগ তৈরি করার দায়িত্ব ফেডারেশনের। অথচ কর্তারা নিজেদের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ রেখেছেন ঘরোয়া পর্যায়ে। হ্যান্ডবল ফেডারেশন ঘরোয়া পর্যায়ে ভীষণ সক্রিয়। বছরব্যাপী নারী-পুরুষ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ, প্রিমিয়ার লিগ, প্রথম বিভাগ লিগ, দ্বিতীয় বিভাগ লিগ এবং স্কুল হ্যান্ডবল লিগ আয়োজনে তাদের ক্লান্তি নেই। যখনই আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন অথবা বিভিন্ন টুর্নামেন্টের জন্য শক্তিশালী জাতীয় দল গঠনের প্রশ্ন আসে, তখনই তারা চড়ে বসেন উল্টোরথে। অথচ একটা সময় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার হ্যান্ডবলে ছিল দ্বিতীয় পরাশক্তি। ভারতের পরপরই আলোচিত হতো তাদের নাম। সর্বশেষ ২০১৯ এসএ গেমসে পতনের প্রমাণটা মিলেছিল হাতেনাতে। ছেলেরা হয়েছিল চতুর্থ, মেয়েরা কোনোমতে জেতে ব্রোঞ্জ।
১৯৯৫ সালে ঢাকায় কমনওয়েলথ হ্যান্ডবল চ্যাম্পিয়নশিপে নারী ও পুরুষ বিভাগে রানার্সআপ হওয়ার পর সেভাবে আর কোনো আন্তর্জাতিক সাফল্য নেই বাংলাদেশের। ২০২২ সালে নারী দল তুরস্কে ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে আট দলের আসরে বাংলাদেশ হয় সপ্তম। দীর্ঘ ৩৪ বছর ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পর ২০২৪ সালে অপসারিত আসাদুজ্জামান কোহিনুর জমানায় আন্তর্জাতিক হ্যান্ডবলে বাংলাদেশ শুধু নিচের দিকেই নেমেছে, বর্তমানে কানাডায় অবস্থানরত কোহিনুর অবশ্য দায় নিতে নারাজ, ‘যারা খেলে, তারা গরিব পরিবার থেকে উঠে আসে, ফলে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে একটু পিছিয়ে থাকে। তা ছাড়া আগের মতো লিগগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয় না। অথচ আমরাই একটা সময় এখানে আন্তর্জাতিক আসর করে ৫০ টাকার টিকিট ২ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। মানুষকে বেঁধে রাখা যায়নি। এখন সেরকমটা হয় না। এর ফলে স্পন্সররাও আগ্রহ হারিয়েছে।’
কোহিনুরের কথার সঙ্গে একমত হতে পারেননি বর্ষীয়ান হ্যান্ডবল কোচ আজগর আলী। তিনি মনে করেন, ফেডারেশন কর্তারা কখনোই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভালো করার স্বপ্ন দেখেননি, ‘ফেডারেশন কখনোই খেলাটা একটি পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেয়নি। আপনি হুট করেই আন্তর্জাতিক সাফল্য পাবেন না। আপনাকে এর জন্য নিয়মিত ট্রেনিং করতে হবে, খেলার অবারিত সুযোগ দিতে হবে। তবেই আপনি সাফল্য পাবেন। হ্যান্ডবলে সেই চর্চাটাই কখনো গড়ে ওঠেনি।’
২০২৪ সালে কোহিনুরের কাছ থেকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেওয়ার পর সনাতনী ভাবনা ঝেড়ে ফেলে খেলাটিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন সালাউদ্দিন আহমেদ। নির্বাহী প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার আগে আট বছর ছিলেন ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক। তাই অতীতের ব্যর্থতার দায় কখনোই এড়িয়ে যান না। তবে অতীত ভুলে আন্তর্জাতিক সাফল্যে চোখ রেখে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা সাজিয়েছেন তিনি, ‘আপাতত আমাদের লক্ষ্য এসএ গেমস। সেখানে ছেলেদের বিভাগে পদক পুনরুদ্ধার, মেয়েদের বিভাগে রুপা জয় ও বিচ হ্যান্ডবলে রুপা জয়ের লক্ষ্যে দল নিয়ে কাজ করছি। এসএ গেমসের প্রস্তুতির জন্য দীর্ঘ ২৬ বছর পর আমরা ঢাকায় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে যাচ্ছি।’
ঢাকায় বসতে যাওয়া আসর হতে যাচ্ছে মেয়েদের জন্য এসএ গেমসের ড্রেস রিহার্সাল। এখানে ভালো কিছু করলে হয়তো হ্যান্ডবলও খুঁজে পাবে আলোর দিশা।



