রাজার মতো ফেরা

ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। ছবি: সংগৃহীত
‘হারিয়ে যাইনি, এটিই জরুরি খবর’— সংগীতশিল্পী অর্ণবের গানটির প্রথম কলি যেন এক পলকা বাতাসে উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়ল সুদূর হিউস্টনে। উজবেকিস্তানের জালে বল পাঠিয়ে টেলিভিশন ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে সেই খবরটাই জানান দিলেন পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। বুনো উল্লাসে মাতোয়ারা সিআর সেভেন বিশ্বকে বলে দিলেন, ‘আমি ফিরেছি’ ‘আমি ফিরেছি’! গত কয়েক দিন যাকে নিয়ে সমালোচনা করেছে সবাই, যাকে পর্তুগাল দলের বোঝা বানানো হয়েছে, দল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি উঠেছে; সেই রোনালদো ফিরলেন রাজার মতো। চোখেমুখে সেই চেনা ঔদ্ধত্য আর জেদ। যারা বলেছিলেন, ‘রোনালদোই পর্তুগালের মূল সমস্যা’ কিংবা ‘৪১ বছরের বুড়োকে দিয়ে আর হবে না’; তাদের গালে যেন সজোরে চপেটাঘাত করলেন জোড়া গোলে।
প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে গোল করলেন টানা ছয় বিশ্বকাপে
ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ ড্র হওয়া ম্যাচে গোলশূন্য ছিলেন রোনালদো। ম্যাচ জুড়েই তিনি ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। বিশ্বমঞ্চে যখন লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা আর্লিং হলান্ডরা মুড়ি-মুড়কির মতো গোল করে যাচ্ছিলেন, তখন রোনালদোর ফর্ম নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল খোদ পর্তুগালেই। সবাই যখন আঙুল তুলছিল, তখন পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেস বাড়ালেন ভরসার হাত। কোচের সেই আস্থার প্রতিদান রোনালদো দিলেন রাজকীয় ঢঙেই। উজবেকিস্তানকে ৫-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দেওয়ার রাতে ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে গড়লেন টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য এক রেকর্ড। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি গোল করেছেন পাঁচটি বিশ্বকাপে।
বিশ্বকাপে রোনালদোর প্রথম ও সর্বশেষ গোলের মাঝে ব্যবধান ২০ বছর ১১ দিন
বিশ্বকাপে তার মোট গোল হলো ১০টি। ২০০৬ সালে ইরানের বিপক্ষে প্রথম বিশ্বকাপ গোল করেছিলেন। ২০ বছরেরও বেশি সময় পর উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপেও গোল করলেন। প্রথম ও শেষ গোলের এই দীর্ঘতম ব্যবধানে তার পাশে শুধু লিওনেল মেসি। আশ্চর্য হলেও সত্য, দুজনেরই প্রথম ও সর্বশেষ গোলের মাঝে ব্যবধান ঠিক ২০ বছর ১১ দিনের!
ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনেও দেখা মিলল সেই উদ্ধত তেজোদীপ্ত রোনালদোর। নিজের ‘আই অ্যাম ব্যাক’ চিৎকার নিয়ে বললেন, ‘আমি এটা বলেছি, যাতে তারা (সমালোচকরা) ভুলে না যায়, টানা ২৩ বছর ধরে আমি এভাবেই পারফর্ম করে আসছি। গত একটা সপ্তাহ আমার জন্য ভীষণ কঠিন আর অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। চারপাশের কথা শুনে মনে হচ্ছিল, আমি যেন ফুটবল থেকেই অবসর নিয়ে নিয়েছি! আজ আমি ভালো খেলেছি, গোল পেয়েছি এবং দলকে সাহায্য করতে পেরেছি। পুরো দলই আজ দারুণ খেলেছে।’
মুখরোচক খবরের আশায় সাংবাদিকরা বারবার মেসির পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন করছিলেন পর্তুগিজ মহাতারকাকে। শুরুতে ভদ্রোচিত জবাব দিলেও একপর্যায়ে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী বিরক্ত হয়ে বলে দিলেন, ‘এসব অর্থহীন প্রশ্ন। অন্যরা কে কী করল, তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই।’ সংবাদকর্মীরাও পেয়ে গেলেন কাঙ্ক্ষিত খবর। ততক্ষণে দাবার ঘুঁটি উল্টে গেছে। গোটা বিশ্ব মেতেছে ৯৭৫ গোলের মালিক রোনালদোর প্রশংসায়। সাবেক আইরিশ অধিনায়ক রয় কিনের মন্তব্যটি উল্লেখ না করলেই নয়, ‘ক্রিস্তিয়ানো কখনোই হারিয়ে যায়নি। সে-ই প্রকৃত মানুষ। লোকে কেন তাকে সন্দেহ প্রকাশ করে?’ ৪১ বছরের এই ‘তরুণকে’ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ সত্যিই ঝুঁকির। কারণ, কিংবদন্তিরা হারিয়ে যায় না; মোক্ষম সময়ে ফিরে আসার মন্ত্রটা তাদের জানাই থাকে।





