রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে ফুটবল
ফিফা বিশ্বকাপ নাকি ট্রাম্পের বিশ্বকাপ?

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের কড়া অভিবাসন নীতির কারণে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর আগেই মাঠের বাইরের বিতর্ক অন্য যেকোনো আসরকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই বিশ্বসেরা খেলোয়াড়, কোচ আর ম্যাচ অফিশিয়ালদের মহামিলনমেলা। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের পর্দা ওঠার মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে ফুটবল বিশ্ব দেখল নজিরবিহীন এক ঘটনা। কোনো সাধারণ সমর্থক বা ফুটবলার নন, খোদ ফিফার তালিকাভুক্ত আফ্রিকার এক নম্বর রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতেই দিল না দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ।
সোমালিয়ার নাগরিক আরতান বাকি ৫১ জন রেফারির সঙ্গে যোগ দিতে মায়ামি বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাকে দীর্ঘ ১১ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সব বৈধ কাগজপত্র ও ভিসা থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাকে সেখান থেকেই দেশের বিমানে তুলে দেওয়া হয়।
এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বৈষম্যবিরোধী প্রচারণামূলক সংস্থা ‘ফেয়ার’। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক পিয়ারা পোয়ার বলেন, 'মার্কিন সরকারের এই বৈষম্যমূলক ভিসা নীতির কারণে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে আসা একজন অফিশিয়াল রেফারিকে ফেরত পাঠানোর মতো নজিরবিহীন ঘটনা আমরা কখনো দেখিনি।' সাবেক আর্সেনাল ও ইংল্যান্ড স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট নিজের ইনস্টাগ্রামে একে 'বিশৃঙ্খলার বিশ্বকাপ' বলে আখ্যা দিয়েছেন।অতীতে রাশিয়া (২০১৮) বা কাতারের (২০২২) মতো বিতর্কিত আয়োজকরাও বিশ্বকাপের সময় ফিফার অফিশিয়াল ও সমর্থকদের জন্য ‘ফ্যান আইডি’ চালুর মাধ্যমে প্রবেশাধিকার সহজ করেছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান মার্কিন প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে, বিশ্বকাপের জন্য কাউকে কোনো বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে না।
২০২৫ সালের জুনে ট্রাম্প সোমালিয়াসহ ১২টি দেশের ওপর পূর্ণ ভিসা নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এর মধ্যে এবারের বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলা তিনটি দেশও (ডিআর কঙ্গো, ইরান ও হাইতি) রয়েছে। ফুটবল সংস্থাগুলোর ধারণা, ট্রাম্পের এই কট্টর অভিবাসন নীতির সামনে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো কার্যত অসহায় আত্মসমর্পণ করেছেন। অথচ ২০২৩ সালে ইসরায়েল দলকে ঢুকতে না দেওয়ায় ইন্দোনেশিয়ার কাছ থেকে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের আয়োজক স্বত্ব কেড়ে নিয়েছিল ফিফা। এবার যুক্তরাষ্ট্রের বেলায় ফিফার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য—'স্বাগতিক দেশের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ফিফা হস্তক্ষেপ করে না।'
শুধু রেফারি আরতানই নন, রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দলগুলোও। ইরাকের প্রধান স্ট্রাইকার আয়মেন হুসেইনকে শিকাগো বিমানবন্দরে সাত ঘণ্টা আটকে রেখে জেরা করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইরান ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে, মার্কিন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে গ্রুপ পর্বে তাদের সমর্থকদের টিকিট বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে।আগামী রবিবার ইরানের মূল দলের যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখার কথা রয়েছে। ইরান অভিযোগ করেছে, তাদের কোচিং স্টাফের গুরুত্বপূর্ণ ১৫ জন সদস্যকে ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ইরান দলকে প্রতিটি ম্যাচের জন্য মেক্সিকোর টিজুয়ানা থেকে উড়ে এসে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাচ খেলে আবার ফিরে যেতে হতে পারে।
টিকিটের আকাশচুম্বী দাম, হোটেল বুকিং নিয়ে সমালোচনা এবং এই রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে খেলা শুরুর আগেই প্রশ্ন উঠে গেছে—বিশ্বকাপ আসলে নিয়ন্ত্রণ করছে কে? ফিফা নাকি ট্রাম্পের মার্কিন প্রশাসন?




