গোলের এভারেস্টে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৯৯৮ সালে জন্ম তার। ফ্রান্স প্রথম বিশ্বকাপ জেতে সে বছরই। বিশ্বকাপের বছরে পৃথিবীতে আসা কিলিয়ান এমবাপ্পে নিজের করে নিয়েছেন বিশ্বকাপটাই। একটা সময় রোনালদো নাজারিওর ১৫ গোলকে মনে হচ্ছিল সর্বোচ্চ সীমা। মিরোস্লাভ ক্লোসা সেই রেকর্ড ভেঙে নিয়ে যান ১৬ গোলে।
এবারের বিশ্বকাপে ১৬ গোলের সেই মাইলফলক গুঁড়িয়ে দিয়েছেন লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জোড়া গোলে মেসিকেও পেছনে ফেললেন এমবাপ্পে। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া বিশ্বকাপ ইতিহাসে তার গোলই এখন সর্বোচ্চ ২২টি (আর্জেন্টিনা-স্পেনের ফাইনালের আগ পর্যন্ত)। রীতিমতো গোলের এভারেস্ট যেন।
মেসি ছয়টি বিশ্বকাপ খেলে করেছেন ২১ গোল। অথচ তার অর্ধেক তিনটি বিশ্বকাপ খেলেই এমবাপ্পের গোল ২২টি! পরিসংখ্যানটা এক কথায় অকল্পনীয়, অবিশ্বাস্য।
এমবাপ্পে ২০১৮ বিশ্বকাপে করেছিলেন ৪ গোল। ২০২২ বিশ্বকাপে ৮ গোল করে জিতেছিলেন গোল্ডেন বুট। এবার করলেন ১০ গোল।
দুই বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোল ছিল ১২টি। এবার এক বিশ্বকাপেই করলেন ১০ গোল। তাতে মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের পাশাপাশি ভাঙলেন মেসির ২১ গোলের রেকর্ডও। মেসি ২১ গোল করতে খেলেছেন ৩৩ ম্যাচ। সেখানে ২২ ম্যাচেই ২২ গোল করলেন এমবাপ্পে। তার ম্যাচপ্রতি গোল গড় ১.০০ আর মেসির ০.৬৪। ২০৩০ বিশ্বকাপে এমন ছন্দে থাকলে কোথায় থামবেন এমবাপ্পে, সেটাই হবে দেখার।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটা সময় ৪-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল ফ্রান্স। সেখান থেকে ফ্রান্স ঘুরে দাঁড়ায় এমবাপ্পের জোড়া গোলে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ম্যাচটি তারা হেরে যান ৬-৪-এ। দল হারলেও বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ২২ গোল করার রেকর্ডটি থেকে যাবে এমবাপ্পেরই।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে খুশি হলেও ফাইনালের আগে ফ্রান্স ছিটকে যাওয়ায় হতাশ এমবাপ্পে। ২০১৮, ২০২২ সালের পর টানা তৃতীয়বার ফাইনাল খেলতে না পারাটা পোড়াচ্ছে তাকে, ‘আমি শুধু প্রতিবার দলকে গোল করতে সাহায্য করার চেষ্টা করি। এটা নিশ্চিত যে, বিশ্বকাপে যখন আপনি এত গোল করবেন, তখন তা আপনাকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তবে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার চেয়ে ফাইনাল খেলতে পারলে আমি বেশি খুশি হতাম।’
১৯৭০ সালে পশ্চিম জার্মানির গার্ড মুলারের পর আর কোনো খেলোয়াড় বিশ্বকাপের এক আসরে ১০ গোল পাননি। তার পাশে এবার নাম লেখালেন এমবাপ্পে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় গোলের পর এমবাপ্পে উদযাপন করেছিলেন তর্জনী উঁচিয়ে। তাতে অনেকেরই মনে পড়ছিল ২০০৬ বিশ্বকাপে রোনালদো নাজারিওর স্মৃতি। সেবার ঘানার বিপক্ষে শেষ ষোলোতে গোলের পর এভাবেই তর্জনী উঁচিয়ে উদযাপন করেছিলেন তিনি। গার্ড মুলারের বিশ্বকাপের ১৪ গোলের রেকর্ড ভেঙে রোনালদোর গোল হয়েছিল ১৫টি। ২০ বছর পর আরেক বিশ্বকাপে তর্জনী উঁচিয়ে ২২ গোলের এভারেস্টে পা রাখার উদযাপনটা করলেন এমবাপ্পে।
সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে অবশ্য উল্লাসে ভেসে যাচ্ছেন না এমবাপ্পে। ম্যাচ শেষে শুধু বলেছেন, ‘আমি মনে করি, এটা নিজের কীর্তি বা সুনামের জন্য ভালো এবং যখন খেলা ছেড়ে দেব, তখন বলা যাবে যে, আমিও সেই খেলোয়াড়দের একজন ছিলাম। তবে এই মুহূর্তে এটি আমার মাথায় সবার আগে আসছে না।’
১৯৯৮ সালের পর ২০১৮ বিশ্বকাপে দ্বিতীয় শিরোপা জিতেছিল ফ্রান্স। ৪ গোল করে তাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন এমবাপ্পে। গতবার ৮ গোল করেও হারতে হয়েছিল ফাইনালে। আর এবার দল ছিটকে পড়েছে সেমিফাইনাল থেকেই। পাশাপাশি হারতে হলো তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও।
ডালাস ও মায়ামির দুটি বেদনাদায়ক রাত অবশ্য এমবাপ্পের মহাকাব্যিক কীর্তিকে মুছে দিতে পারবে না কখনো।




